সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদের সভায় বক্তারা

আলেমদের যখন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন হারামের ফতোয়া দেয়া হচ্ছে

‘আলেমদের যখন সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন তারা হারামের ফতোয়া দিচ্ছেন।'

নিজস্ব প্রতিবেদক
ওলামা মাশায়েখ পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা
ওলামা মাশায়েখ পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা |নয়া দিগন্ত

দেশে যখন ইসলামের পক্ষে একটি গণজোয়ার তৈরি হয়েছে সে সময়ে এসে গুটি কয়েক আলেমের ভিন্নধর্মী বক্তব্য দেয়া অনভিপ্রেত। একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ পদে থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে হালাল-হারামের ফতোয়া দেয়াও অনুচিত।

আর যেখানে সরকার ও ধর্ম মন্ত্রণালয় ইমাম-খতিবদের সাথে মতবিনিময় করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে সেই মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মসজিদের খতিব ‘না’-এর পক্ষে কথা বলায় জাতি বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। সরকারের উচিত তাকে দ্রুত অপসারণ করা অথবা তার নিজেরই পদত্যাগ করে সরে যাওয়া উচিত।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদ আয়োজিত ‘গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনে আলেম সমাজের ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দেশের শীর্ষ আলেমরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

এ সময় আলেমরা আরো বলেন, ‘আলেমদের যখন সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন তারা হারামের ফতোয়া দিচ্ছেন। এজন্য জনগণ এখন তাদের কথা শোনাকেই হারাম মনে করছে।’

ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন কমিটির আমির মাওলানা আবু তাহের জিহাদী আল কাসেমীর সভাপতিত্বে আলোচনা করেন, কোরআন ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হালিম, বিশিষ্ট আলেম সাইয়েদ কামাল উদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরী, বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন, সেক্রেটারি ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী, বিশিষ্ট ইসলামী বক্তা শেখ কাজী ইব্রাহীম, অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন, ইয়াহইয়া উল ইলুমিস সুন্নাহ সভাপতি মাওলানা হাবীবুল্লাহ মো কুতুবুদ্দীন, তানজীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবীবুল্লাহ মুহাম্মদ ইকবাল, বাংলাদেশ ইমাম পরিষদের সভাপতি মাওলানা লুৎফর রহমান, ড. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা হাবীবুল্লাহ রুমী, ড. মীম আতিকুল্লাহ, মুফতি মহিউদ্দীন, মাওলানা নুরুজ্জামান নোমানী, অধ্যক্ষ শাহাজান মাদানী, অধ্যাপক মাওলানা আনম রফিকুর রহমান আল মাদানী, মুফতি মাহবুবুর রহমান, ছারছিনার ছোট পীর শাহ হাবিবুল্লাহ সিদ্দিকী, মীরসরাই দরবার শরীফের পীর মাওলানা আবদুল মোমিন নাছেরী, মুফতি আবুল কাসেম কাসেমী, মুফতি মোহাম্মদ হোসাইন আকন্দ, মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালী প্রমুখ।

মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘যেসব সংসদে জামায়াতের প্রতিনিধি ছিল সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলেম ছিলেন। তারা নামাজের বিরতি, মাথা নতজানু করে না ঢোকাসহ ইসলামের পক্ষে কাজ করেছেন। জামায়াত প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ইসলামের মূল ভিত্তি কোরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা সংগঠন পরিচালনা করে আসছি। আমরা মওদুদীর আকিদাকে ধারণ করি না। ইমাম আবু হানিফা আমাদের ফেকাহের ইমাম। অথচ আমাদের মওদুদীবাদী ও আকিদা খারাপ বলা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে আলেমরা হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই নারেয়ে তাকবির ধ্বনিতে শয়তান পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন ঢাবিতে নারেয়ে তাকবির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আগামীতে আলেমরা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হবেন। যিনি বঙ্গভবনে যাবেন তিনিই নামাজের ইমাম হবেন। আশা করি ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে দ্বীনের পক্ষে, ইসলামের পক্ষের শক্তি বিজয়ী হবে।’

তিনি বলেন, ‘আলেমরা যখন আগামী সংসদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন হারামের ফতোয়া দেয়া হচ্ছে। এভাবে ১১ দলীয় জোটকে ভিন্ন তকমা দিয়ে পিছিয়ে দেয়া মানুষ গ্রহণ করছে না। মানুষ এখন তাদের কথা শোনাকেই হারাম মনে করছে। কোনো চক্রান্ত ১১ দলের পক্ষের জাগরণ ঠেকাতে পারবে না।’

সাইয়েদ কামাল উদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরী বলেন, ‘কোরআনের খাতিরে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ইসলামের বিজয় ঠেকাতে কারো চক্রান্ত কাজে আসবে না। এবারের নির্বাচনে মানুষ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে থাকবে।’

মাওলানা যায়নুল আবেদীন বলেন, “যারা ইনসাফের পক্ষে তারা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দিবেন। আর যারা ‘না’র পক্ষে ব্যাখা দাঁড় করাচ্ছে তারা ফ্যাসিবাদের দোসর। তাদের জাতি প্রত্যাখান করবে।”

ড. মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে আলেমদের জঙ্গি বানানো হয়েছিল। তাদের গ্রেফতার-নির্যাতন করা হয়েছিল। আমরা আর সেই ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। নতুন করে যারা ফ্যাসিবাদ হতে চায়, তাদেরও আলেমরা প্রত্যাখান করবে। চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজদের জাতি প্রত্যাখান করবে। আলেমদের বিভক্তির কারণে কেউ যেন ইসলাম নিয়ে তামাশা করার সুযোগ না পায় সেজন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে।’

মুফতি কাজী ইব্রাহিম বলেন, ‘এবার জামায়াতে ইসলামী সব ধরনের মানুষকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে। এটাই সঠিক পদ্ধতি হয়েছে। কেউ যেন বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করতে না পারে সেজন্য আলেম সমাজকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’

মাওলানা আবু তাহের জিহাদী বলেন, ‘কিছু আলেম তাদের জবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। এভাবে লাগামহীন কথা বলতে থাকলে জাতির যে ক্ষতি হবে তা আমরা টের পাচ্ছি না। আমাদের ফতোয়া দেয়ার আগে চিন্তা-ভাবনা করে দেয়া উচিত। আমরা দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে জাতিকে যেন ভুল মেসেজ না দিই। এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

তিনি নির্বাচনে গণভোটে সবাইকে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। আর সংসদ নির্বাচনে যাদের আল্লাহর ভয় আছে তাদের ভোট দিতে হবে বলেও তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

মাওলানা আ ন ম রফিকুর রহমান আল মাদানী বলেন, “যেখানে সরকার ও ধর্ম মন্ত্রণালয় ইমাম-খতিবদের সাথে মতবিনিময় করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন, সেখানে সেই মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মসজিদের খতিব ‘না’র পক্ষে কথা বলায় জাতি বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে। সরকারের উচিত তাকে দ্রুত অপসারণ করা অথবা তার নিজেরই ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তওবা করে পদত্যাগ করা উচিত।”