সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার জনরায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিবর্তে নানাবিধ দ্বিচারিতামূলক আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে। তারা শুধু জুলাই সনদের বিরোধিতা নয়, তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা মূলত সংস্কারের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে।’
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘গণভোটের আলোকে জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি : সরকারের দায় ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে একথা বলেন।
সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র প্রতিনিধিরা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনরায়ের গুরুত্ব ও সরকারের অবহেলার বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জনগণ তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার টালবাহানা করছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনরায়ের অমর্যাদা করার পরিণতি শুভ হয় না। অনতিবিলম্বে জনগণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী পদক্ষেপ না নিলে সরকারকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বিএনপির চরিত্র হচ্ছে, জনগণের সাথে প্রতারণা করা। ঐতিহাসিকভাবে তারা জনগণের রায়কে ভয় পায়। যাদের জন্ম হয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে, তারাই এখন গণভোটের বিপক্ষে অবস্থা নিয়েছে।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসু’র জিএস এস এম ফরহাদের সঞ্চালনায় ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগার স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির তার বক্তব্যে আইনি ও সাংবিধানিক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৭২-এর সংবিধান তৈরি হওয়ার পর প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল সংবিধানকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা ও পরিবর্তন করে একটি স্থায়ী সংকট তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা যেন চোর-পুলিশ খেলার মতো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি।’
‘বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এমনভাবে এককেন্দ্রিক করা হয়েছে যে, যদি তা বিকেন্দ্রীকরণ করা না যায়, তবে যেই-ই ক্ষমতায় আসুক, সে বাধ্য হবে গণতান্ত্রিকভাবে নয়, বরং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে।’
তিনি আরো বলেন, “এ কারণেই ‘জুলাই সনদ’র প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, পাশাপাশি দেশের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে—তা বাস্তবায়ন না হলে, জুলাই অভ্যুত্থানের পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারব না। বরং আবারো একক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, এবং দেশ পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।”
‘গণভোট বা জনমতের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনি সংকটের পাশাপাশি নৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি হবে,’ বলেন শিশির মনির।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ১৯৭২ সালের সংবিধানের সংকট প্রসঙ্গে বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল, সেখানে আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই—তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—এই তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্র পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। সেই ঘোষণাপত্রের আলোকে লাখ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ আমরা কি সত্যিই পেয়েছি—এটাই আজকের বড় প্রশ্ন।’
তিনি আরো বলেন, ‘১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রণয়ন প্রক্রিয়াতেই মৌলিক সমস্যা ছিল। জনগণের মতামত নেয়া হয়নি। পৃথিবীর কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রেই জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া সংবিধান প্রণয়ন করা হয় না—কিন্তু আমাদের দেশে তা হয়েছে। এই ম্যান্ডেটবিহীন সংবিধান এত বছর পরেও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রজন্ম এটি মেনে নেবে না।’
বিশিষ্ট আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহীদুল আলম বলেন, “আমাদের এ দেশকে কোনো না কোনোভাবে মেরামত করতে হবে। ‘জুলাই সনদ’ সেই মেরামতের কাজটিই করতে চায়। অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই জায়গায় পৌঁছেছি।”
‘মেরামতের ক্ষেত্রে সবাই হয়তো একমত নাও হতে পারে, দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে আমরা যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাই, সেখানে পৌঁছতে হলে মেরামত করা প্রয়োজন। কিছু জায়গায় সমস্যা আছে বা মতভেদ রয়েছে বলে মেরামত বন্ধ করে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘মতভেদ থাকা যেকোনো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিষয়। আমরা বিতর্ক করব, তর্ক করব, মতামত দেবো—তবুও আমাদের সবার মিলিত প্রচেষ্টায় এই দেশকে গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন তার বক্তব্যে সংসদীয় দায়বদ্ধতার ওপর জোর দেন এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ ক্ষেত্রে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অংশ হিসেবে কিছু আইনি প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অথচ যার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে না। আইনি প্রশ্ন তুলে মূলত জুলাই সনদ ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের দোহাই দিয়ে যেভাবে ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, আমরা সেটার বিপক্ষে। যেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তাদের মাস্টারমাইন্ড খাইরুল হক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আনীত বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ফ্যাসিবাদকে গেড়ে বসার সুযোগ করে দিয়েছিল। সেই একই প্রক্রিয়ায় বর্তমানে সংবিধানের দোহাই দেয়া হচ্ছে।’
এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব তাহসিন রিয়াজ ও জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাকসু) জিএস মাজহারুল ইসলাম ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে জনরায় দ্রুত বাস্তবায়নের আল্টিমেটাম দেন। তারা স্পষ্ট জানান, ক্যাম্পাস থেকে রাজপথ পর্যন্ত সাধারণ ছাত্রসমাজ জনরায়ের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে।
সেমিনারে বক্তারা একমত হন যে, বর্তমান সরকার যদি জনরায় বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ অব্যাহত রাখে, তবে তা দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। বক্তারা সরকারকে অবিলম্বে সকল দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে জনরায় বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানান।
সেমিনারে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ ছাত্ররা উপস্থিত ছিলেন।



