অসমাপ্ত অথচ চির ঐশ্বর্যের এক গল্পের নোঙ্গর ছিঁড়ে গেলো!

মেহেদিরাঙা হাতটি যখন আধিপত্যবাদের রাজনৈতিক হত্যায়, রক্তের আলপনায় রঞ্জিত— তখন ভয়ঙ্কর সব শোকের মাঝে, দেশের রাজনীতি তাকে টেনে নিয়েছে কঙ্কর বিছানো অসহিষ্ণু রাজপথে, যা তিনি ভাবেননি কখনো। ’৮৪-এর দলীয় মুকুটের চেয়ারটি যেমন ছিল সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনের মতো উত্তপ্ত, তেমনি এই চেয়ার তার বিপত্নীক জীবনকে করে তুলেছে সফিস্টিকেটেড। রাজনীতির মহাকাব্যিক জগতে দিনে দিনে তিনি হয়ে উঠলেন, শতধাবিভক্ত ভাটি-বাঙলার ‘আলোর পাহাড়’।

তাসনীম মাহমুদ
বেগম খালেদা জিয়া
বেগম খালেদা জিয়া |নয়া দিগন্ত

‘আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’ —বেগম খালেদা জিয়া

না— তিনি ছেড়ে যাননি। তিনি আছেন, তিনি ছিলেন; তিনি থাকবেন অনন্তর জীবনের বিপ্লবে, সাহসে, ত্যাগ-তিতিক্ষা, কুরবানী, বিজয়ের প্রতিটি স্লোগানে... এই বাংলাদেশ যতদিন থাকবে— পৃথিবীর ইতিহাস, হেরোডোটাসের কলম বারবার খুঁজে ফিরবে সুন্দরের উপমা, শান্ত-সরল, অকুতোভয়, নির্ভীক, আপসহীন এমন এক নারীর সত্যগল্প যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনকে করেছেন অগণন সংখ্যায় উৎসর্গ।

যিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিশ্রণের এমন এক বিরল শরবত— যা ১৯৪৭ পরবর্তী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, স্নায়ু-যুদ্ধের সমীকরণ এবং তৃতীয় পৃথিবীর উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগঠনে জটিল আখ্যানের আবে হায়াত।

১৯৪৫-এর এক স্নিগ্ধ-আভায় জন্মের পর পুতুলের মতো জীবন নিয়ে, ঘাস-ফড়িঙের স্বাধীনতায়- স্বকীয়তার বিমুগ্ধ উপস্থাপন, আরব্যগল্প, ইউরোপীয় মেজাজ আর বাঙলার সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তিনি হয়ে উঠেছেন অভিজাত মুসলিম সমাজের অনন্য উদাহরণ। কে এমন সম্ভাবনার আবহ এনে দিয়েছেন পশ্চাদপদ এই জমিনে? তিনি আর কেউ নন; তিনি আধুনিক বিশ্বে আপসহীনতার মূর্ত প্রতীক, আইরনি বেগম খালেদা জিয়া।

৩০ মে ১৯৮১ সালে মেহেদিরাঙা হাতটি যখন আধিপত্যবাদের রাজনৈতিক হত্যায়, রক্তের আলপনায় রঞ্জিত— তখন ভয়ঙ্কর সব শোকের মাঝে, দেশের রাজনীতি তাকে টেনে নিয়েছে কঙ্কর বিছানো অসহিষ্ণু রাজপথে, যা তিনি ভাবেননি কখনো। ’৮৪-এর দলীয় মুকুটের চেয়ারটি যেমন ছিল সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনের মতো উত্তপ্ত, তেমনি এই চেয়ার তার বিপত্নীক জীবনকে করে তুলেছে সফিস্টিকেটেড। রাজনীতির মহাকাব্যিক জগতে দিনে দিনে তিনি হয়ে উঠলেন, শতধাবিভক্ত ভাটি-বাঙলার ‘আলোর পাহাড়’।

১৯৯১-এর গণতান্ত্রিক যাত্রায় ঐতিহাসিক নির্বাচনে দেশের প্রথম এবং বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে আবির্ভাব হয় খালেদা জিয়া নামক এই পাললিক প্রতিনিধির। তার কূটনীতির আন্তর্জাতিক শীতল সম্পর্কে ঘুরে দাঁড়ায় ভৌগলিকতার নীল নকশায় বন্দি হিমালয়ের এই দুঃখিনী কন্যা।

২০০৬ অবধি, চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সোনার কাঠি-রূপার কাঠির ছোঁয়ার মতো বিশ্বের দরবারে সহসা জেগে উঠা এ ভূ-খণ্ডের উত্থান দেখে, হিস্ হিস্ করে ওঠে আজন্ম আধিপত্যবাদের কালোছায়া... লগি-বৈঠার তাণ্ডব আর বিশ্বাসবিক্রির মহাজন মঈন-ফখরুদ্দীনের ক্রীড়ানক শাসনে ক্ষমতার কৃষ্ণকেদারার দৌরাত্ম্যে ‘ডু অর ডাই’ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি করে তোলে ডাইনামিক নেতৃত্বের নেত্রী ম্যাডাম জিয়াকে।

দেশ-মাতৃকার অসম্ভব প্রেম তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি, পারেননি পবিত্র রক্ত, ভূমির সাথে গোলাম হোসেনের খঞ্জরে গাদ্দারী করতে। তাই মানুষের মাঝে মানুষের পরিচয়ে, সক্রেটিসের হেমলক পানের মতো আপসহীন-দৃঢ় সিদ্ধান্ত বেছে নেন তিনি। করা হয় গৃহবন্দি। বছরের পর বছর থাকা এই বন্দি জীবনে কলিজার ঘামে জন্ম দেয়া ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে দেখেছেন ফ্যাসিবাদীর নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করতে। বালিরবাঁধের মতো ভেঙে যাওয়া হৃদয়ে দেখেছেন, বড় ছেলে তারেক রহমানকে করা নির্যাতন-নির্বাসন।

তবু ভেঙে যাননি তিনি। শিশির বিন্দুর মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েনি চোখের পানি। আবেগের মোহমায়ায় ঠোঁটের ক্যানভাস থেকে বের হয়নি কোনো রঞ্জিত কথা। তথাপি তিনি ইস্পাত-কঠিন-দৃঢ় করে তুলেছেন মা-নামক হৃদয়ের কমল-কুসুম-মমতার পরশ। আধিপত্যবাদী ফ্যাসিবাদ বিতাড়নের শপথে দিনে দিনে হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক দলসমূহের বিপ্লবী আইকন।

চমকিত বিকেলের রোদের মতো প্রশান্তির চোখে তিনি দেখলেন, আটশো বছরের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। স্বভাব-সুলভ ভঙ্গিমায় হেসে উঠলেন আর অসমাপ্ত অথচ চির ঐশ্বর্যের এক গল্পের নোঙ্গর রেখে গেলেন বাঙলার মাটি-জল-মানুষের জন্য।

আমার সিক্তচোখ বুজে আসছে হাহাকারের ক্লান্তি নিয়ে— আর স্বপ্নের বিরহীতন্দ্রায় একে একে জড়ো হচ্ছে জান্নাতের সুমিষ্টঘ্রাণ নিয়ে সফেদ ফেরেশতারা... তার যেন সম্মিলিত সুরে গাইছে :

‘সো জা রাজকুমারী সো জা

সো জা ম্যায় বলিহারী সো জা

সো জা মিঠে সপনে আয়ে

সপনো মে পিয়া দরশ দিখায়ে

উড় কর রূপনগর মে জায়ে’।