সংসদে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন

নিজামী-সাঈদী বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন

‘একজন বালক হিসেবে এই সংসদের গ্যালারি থেকে আপনাদেরকে দেখেছিলাম। আজ দ্বিতীয় প্রজন্মের সংসদ সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে বক্তব্য দিচ্ছি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন
ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন |সংগৃহীত

জাতীয় সংসদের বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেছেন, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেককেই শতাব্দীর জঘন্যতম মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে।

তিনি বলেছেন, অবিচারকে বিচার, আর অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দেশকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। এই ফ্যাসিবাদকে অপসারণ করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য জুলাই ছাত্র-জনতার বিপ্লব অনিবার্য হয়ে পড়ে।

রোববার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

বক্তব্যের শুরুতে স্মৃতিচারণ করে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সন্তান নাজিব মোমেন বলেন, ‘১০-১২ বছরের একজন বালক হিসেবে এই সংসদের গ্যালারি থেকে আপনাদেরকে দেখেছিলাম। আজ দ্বিতীয় প্রজন্মের সংসদ সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে বক্তব্য দিচ্ছি। আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে বসে আছেন, সেখানে উনার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বসতেন। এই সংসদে আমার শহীদ পিতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মরহুম আব্দুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকাসহ অনেকেই ছিলেন। আজ তারা আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের সন্তান হিসেবে আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই সংসদে এসেছি।’

বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা সকলেই ফ্যাসিবাদের নির্যাতনের একটি কঠিন অধ্যায় পার করে এখানে এসেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে এক কাপড়ে তার বাসা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল, হামলা-মামলা করে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে; একইভাবে আমার পিতা শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেককেই শতাব্দীর জঘন্যতম মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। আমাদের কাউকে কাউকে গুম করা হয়েছিল, দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আজ আমরা এখানে শুধু আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছি না, বরং সকল নির্যাতিত পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করছি।’

জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময় দেখেছি যখন অবিচারকে বিচার এবং অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে সংবিধান সংশোধন করে ফ্যাসিবাদকে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সেই ফ্যাসিবাদকে অপসারণ ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। ২৪-এর জুলাইয়ে এদেশের ছাত্র-জনতা দলমত নির্বিশেষে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে সেই ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করেছে।’

জাতীয় সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বা সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়নের আইনি দিক নিয়েও কথা বলেন ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির আদেশকে আইন বা অধ্যাদেশ নয়- বলে যে কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের সুস্পষ্ট সংজ্ঞায় বলা আছে, আইন অর্থ আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ। সুতরাং রাষ্ট্রপতি যেসব আদেশ দিয়ে থাকেন, সেগুলো এই সংবিধান অনুযায়ী আইন। আমাদের দেশে এটিই প্রথম আদেশ নয়, ১৯৭২ সালেও রাষ্ট্রপতির আদেশে “রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপলস অর্ডার” (আরপিও) প্রণীত হয়েছিল। সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নিয়েছি আমরা, তাই সংবিধান অনুযায়ী যা আইন, তা আমাদের মানতে হবে।’

সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বিষয়ে তিনি অষ্টম সংশোধনীর (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলা) রায় এবং পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘জুলাই সনদকে আমরা সম্মান করি, কিন্তু সময় নেই বলে তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নজির অনুযায়ী সংসদ চাইলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে না।’

এছাড়া সংস্কার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সময় বের করে সঠিক সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করার প্রতি জোর দেন তিনি।