জামায়াতের নিরাপদ বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে মোট আটটি ভাগে ৪১টি বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরেছেন দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Location :

Dhaka City
জামায়াতের নিরাপদ বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা
জামায়াতের নিরাপদ বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা |নয়া দিগন্ত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইশতেহারে মোট আটটি ভাগে ৪১টি বিষয় জাতির সামনে তুলে ধরেছেন দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি করা ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ৮৬ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারের প্রথমে পাচঁটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ এবং পাচঁটি বিষয়ে ‘না’ এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। যেখানে হ্যাঁ-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। অপরদিকে যে পাচঁটি বিষয়ে জামায়াত না বলেছে তারমধ্যে রয়েছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, অধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।

‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিসহ ইনসাফ ও ন্যায় ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবকের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।

ইশতেহার প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশার ২৫০-এর বেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয় তৈরি করা জনগণের মতামতকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষের মতামত চাওয়া হলে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার মতামত দেন ও তাদের প্রত্যাশার কথা জানান। ওয়েবসাইটে দেয়া মানুষের প্রত্যাশা ও মতামতকে ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি আজকে একজন আহত সৈনিক। গত কয়েক দিন চরিত্র হননে আমার ওপর চারিদিক থেকে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। যারা আমার চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে, তাদেরকে আমি ক্ষমা করে দিলাম। আমি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতি এ দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা খুবই সীমিত। কিন্তু গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্র সেটুকুও পূরণ করতে পারিনি। আজকে ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা নেই, সম্মান নেই। এটা সম্পদের অভাবে হয়েছে তা আমি স্বীকার করি না। তাহলে এত টাকা বিদেশে পাচার হলো কীভাবে? আমাদের সংকট হলো দায়বদ্ধতা, সততা, চরিত্র ও দেশপ্রেমের অভাব। আমি কে এটা চিন্তা করার আগে, আমি ভাবতাম আমার দেশটার কথা। আমরা বলি ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়; কিন্তু আমরা কি তা ৫৪ বছরে প্রমাণ করতে পেরেছি? বরাং উল্টোটাই প্রমাণিত হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ২৪-এ ছাত্র সমাজকে বধ্য করা হয়েছে রাস্তায় নামতে। মেধার স্বীকৃতি নিশ্চিত করার জন্য তাদের দাবি ছিল। এই দাবি আদায়ের পথে প্রথম বাঁধ ছিল ১৫ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশ জেগে উঠেছিল। পরদিন আবু সাইদ বলেছিল, বুকের ভেতর তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর। তাকে হত্যা করা হয়। তার এই হত্যা নিয়েও রাজনীতি করা হয়েছে। অশেষে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এরপর লাশের পর লাশ দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হলো। ১৪শ’ জনকে হত্যা করা হলো। বহু শ্রেণি-পেশার মানুষ এই বিপ্লবে জীবন দিয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা মজলুম ছিলাম, কিন্তু ৫ আগস্টের পর আমরা তা ভুলে গেছি। মনে থাকলে জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতাম। এ সময়ের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য লেগে গেছে। আমরা ছিলাম মজলুম, আমরা যেন না হয়ে উঠি জালিম।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘যে কৃষক আমাদের খাবার তুলে দেন, আমরা সেই কৃষিতে বিপ্লব আনতে চাই।

তিনি বলেন, শিল্পগুলোকে আমরা শিশুর মতো লালন করবো। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের যুব সমাজ অনেক ইনোভেটিভ। তারা পারবে। তাদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে ইশতেহার দেয়া হয়েছে। সমস্যা আমাদের মাথাগুলোতে। ওইটা ঠিক হওয়া উচিত। আমরা কোনো দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। আমি জামাতের বিজয়ে বিশ্বাসী নয়, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ে বিশ্বাসী। ৬৪ জেলার সবগুলোতে আমরা মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলবো। কর্মস্থলে ডে কেয়ার থাকবে। ৫ বছর পর্যন্ত শিশুর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবো।

জামায়াত আমির বলেন, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সার্টিফিকেট উৎপাদনের। আমরা এটার আমূল পরিবর্তন করতে চাই। ক্রমান্বয়ে প্রফেশনাল এটুকেশন চালু করতে চাই। আমি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বীর বলবো। কেউ বিদেশে মারা গেলে তার লাশ সরকারি খরচে দেশে আনবো। আমরা তাদের জন্য ফান্ড করবো। দেশে ফিরে এলে তাদের হাতেও কাজ তুলে দেবো তাহলে তাদের হাতাশা থাকবে না।

জামায়াত আমির বলেন, ‘চা শ্রমিকদের জীবন দেখলে চোখে পানি আসবে। আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেয়, তবে আমরা চা শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবো। চা বাগানের শ্রমিকদের ছেলেমেয়েও এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন।’

ইশতেহার অনুষ্ঠানে- আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, ইউএনডিপি, আইআরআই, এনডিআই, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কুটনীতিবিদগণ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সিনিয়র সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

সামনের বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও ইনসাফপূর্ণ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এখনই প্রয়োজন আমাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় বা আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের আজ এক কাতারে শামিল হওয়ার সময় এসেছে। আমরা সেই কাতারে শামিল হয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।

সে লক্ষে চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।

ইশতেহারের প্রথম ভাগে রয়েছে- জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ. শাসন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতে জবাবদিহীতামূলক জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়ন, আইন ও বিচার ব্যবস্থা, তথ্য ও গণমাধ্যম।

আত্মনির্ভরতার পথে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে, পররাষ্ট্র নীতি, প্রতিরক্ষা নীতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ।

টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপকভিত্তিতে কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে তৃতীয় ভাগ রয়েছে- মাথা উচু করে দাড়ানোর অর্থনীতি, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট, শিল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান।

স্বনির্ভর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নকে সামনে রেখে ইশতেহারের চতুর্থ ভাগে রয়েছে- আগামীর কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা। মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়নকে সামনে রেখে পঞ্চম ভাগে রয়েছে- শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নৈতিকতা।

সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সামনে রেখে ইশতেহারের ষষ্ঠ ভাগে রয়েছে- যোগাযোগ ও যাতায়াত, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত ও ভূমি ব্যবস্থাপনা। যুবকদের নেতৃত্বে প্রযুক্তি বিপ্লব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে সপ্তম ভাগ ইশতেহারে বলা হয়ছে- যুব ও ক্রীড়া, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতের কথা।

সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনকে সামনে রেখে ইশতেহারের অষ্টম ভাগে বলা হয়েছে- সমাজকল্যাণ, নিরাপদ নারী ও শিশু, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ।

আগামী পাঁচ বছরের সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে তার মধ্যে রয়েছে- ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন। বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন। যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া। নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ। সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন। প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ। সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা। বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা। জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা। ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ণ ও কর্মসংস্থান তৈরি। শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা। প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা। আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান (Universal Healthcare System) এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা। দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা। যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা। সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

ইশতেহারে বলা হয়, বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। বিপুল জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত জুলাই বিপ্লবের ঐক্য, আযাদীর তীব্র আকাঙ্খা এবং শক্তিশালী ও উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে নিজেদের স্থান গড়ে তোলার প্রত্যয় বাস্তবায়ন করার সম্ভাবনা যেমন সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দেখা যাচ্ছে বিভেদ, স্বৈরাচার, দুর্নীতি এবং বিদেশের শর্ত ও ইঙ্গিতে দেশ পরিচালনার সেই পুরানো বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা। উর্বর ভূমি, বিপুল তরুণ জনশক্তি, সমরূপ, সহনশীল ও উদ্যমী জনগোষ্ঠী এবং সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ– ইত্যাদি বিচারে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে এক অপার সম্ভাবনার দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের অষ্টম এবং মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের আগে মোঘল সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি, আর বাংলা ছিল সেই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ পরপর দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করলেও দুর্ভাগ্যবশত অসৎ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বের কারণে তা অর্থবহ হয়ে উঠেনি। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল, তা গত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

অতিতের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে সামনে এনে বলা হয়- ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিন তিনটি ভুয়া ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, জনগণের ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই সময়ের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা হয়েছে, দেশের ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনসহ সার্বিকভাবে দেশকে এক বিভীষিকাময় টর্চার সেলে পরিণত করা হয়েছিলো। হাজারো মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন; অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে প্রিয়জনকে। লাখো হামলা-মামলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের জীবন ছিলো চরম বিপর্যস্থ। প্রায় সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও সংগঠন জুলুমের শিকার হয়েছে।

এই সময়েই দেশের অর্থনৈতিক খাতও গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। লুটপাট, অর্থ পাচার, ব্যাংক খাত ধ্বংস, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের বিস্তার—সবমিলিয়ে একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক পতন প্রত্যক্ষ করেছে দেশ। ফলশ্রুতিতে আজ দেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশাগ্রস্ত। সেই নিকষ অন্ধকার কেটে জুলাই বিপ্লব একটি নবজাগরণের সূচনা করেছে। হাজারো তরুণ জীবন উৎসর্গ করে একটি ফ্যাসিবাদবিহীন, স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ দেশের গণতন্ত্র, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এক নতুন সকাল উপহার দিয়েছে। বহু দশক ধরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে একদল সৎ, যোগ্য ও সুশৃঙ্খল মানুষ তৈরী করতে। গত পনেরো বছরে জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নিপীড়িত রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, অগণিত কর্মী ও সমর্থকরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবুও জামায়াত নেতৃত্ব কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতির পথ ধরেনি। বরং তারা সবসময় দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং সংযম, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এখনই সময়—বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার। তরুণ সমাজকে সাথে নিয়ে একটি নিরাপদ, মানবিক, ইনসাফভিত্তিক, সমৃদ্ধ, উন্নত ও শক্তিশালী বাংলাদেশের জন্য পথচলা শুরু করার। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সেই লক্ষ সামনে রেখে দীর্ঘ গবেষণা ও চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে একটি আধুনিক, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা প্রস্তুত করেছে।

এই ইশতেহারকে একটি পরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি উল্লেখ করে বলা হয়, চটকদার, মনভোলানো, অবাস্তব প্রতিশ্রুত নয়, আমরা ফোকাস করেছি বাস্তবায়ন যোগ্য স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় সংস্কারে। এর ভিত্তি হচ্ছে স্বচ্ছ, গতিশীল ও যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ ও সৎ কর্মীবাহিনী, সুস্পষ্ট উন্নয়ন লক্ষ্য এবং জনগণকেন্দ্রিক নীতি। দেশের সকল ধর্ম, অঞ্চল, নারী-পুরুষ, শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাথে নিয়ে, একতা, মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েই জামায়াতে ইসলামী আজ জাতির সামনে উপস্থিত করছে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার ২০২৬’।

ইশতেহার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।