নতুন বছরে বাংলাদেশ

নির্বাচন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন পরীক্ষা

নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখার সুযোগ আর নেই। নির্বাচন, সংস্কার, অর্থনীতি, তরুণসমাজ, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা তথ্যযুদ্ধ- সবকিছু মিলিয়ে এগুলো একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে: এই রাষ্ট্র কার জন্য, কিভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই প্রশ্নকে শুধু উচ্চারণই করেনি, রাষ্ট্রের সামনে তার উত্তর দেয়ার দায়ও চাপিয়ে দিয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
স্বাগতম ২০২৬
স্বাগতম ২০২৬ |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ নতুন একটি বছরে প্রবেশ করছে এমন এক সময়, যখন রাষ্ট্র তার ইতিহাসের অন্যতম গভীর রূপান্তরপর্ব অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি ক্ষমতা, রাষ্ট্রযন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নগুলোকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ফলে নতুন বছর বাংলাদেশের জন্য কেবল ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের বিষয় নয়- এটি একটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বছর, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটির সাথে আরেকটি গভীরভাবে সংযুক্ত। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, অর্থনৈতিক চাপ সামাজিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, আর এসবের ওপর ভর করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূরাজনৈতিক হিসাব জটিল হয়ে উঠছে।

১. গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সঙ্কট

নতুন বছরের সবচেয়ে বড় ও নির্ধারক চ্যালেঞ্জ হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জাতীয় নির্বাচন আয়োজন। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগে জর্জরিত।

অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্নে দু’টি বিপরীত চাপ কাজ করছে। এক দিকে রয়েছে দ্রুত নির্বাচনের দাবি- যাতে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত না হয়। অন্য দিকে রয়েছে কাঠামোগত সংস্কারের দাবি- যাতে আগের মতো নির্বাচন ‘অনুষ্ঠান’ হয়ে না দাঁড়ায়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা নতুন বছরের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা।

এখানে ব্যর্থতা মানে শুধু একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন নয়; ব্যর্থতা মানে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে প্রশ্নের মুখে ফেলা।

২. সংস্কার প্রশ্নে সময় বনাম গভীরতার দ্বন্দ্ব

নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে যে মৌলিক রাজনৈতিক সঙ্কটটি সবচেয়ে তীব্র হয়ে উঠছে, তা হলো সংস্কারের সময় বনাম সংস্কারের গভীরতার দ্বন্দ্ব। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর উত্তর না দিয়েই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। একই সাথে এ সত্যও অস্বীকার করা যায় না যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক আদেশে সম্পন্ন হয় না; এটি সময়, ঐকমত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির দাবি রাখে।

সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও নিরাপত্তা খাতÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জমে উঠেছে। ফলে সংস্কারের দাবি এখন আর কোনো একটি দলের বা গোষ্ঠীর নয়; এটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা একটি সামাজিক আকাক্সক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এই সংস্কার কতদূর পর্যন্ত এবং কোন সময়সীমার মধ্যে?

এক দিকে যদি সংস্কারের নামে দীর্ঘ সময় ক্ষমতা ধরে রাখা হয়, তবে ‘অনির্বাচিত শাসন’ নিয়ে বিতর্ক অনিবার্যভাবে তীব্র হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, দীর্ঘ অন্তর্বর্তী বা বিশেষ ব্যবস্থাপনা শেষ পর্যন্ত নিজেই বৈধতার সঙ্কটে পড়ে। জনগণের চোখে তখন সংস্কার নয়, বরং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই ধারণা তৈরি হলে সংস্কারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।

অন্য দিকে যদি দ্রুত নির্বাচনের তাগিদে সংস্কারকে সীমিত বা প্রতীকী করা হয়, তবে পুরনো ক্ষমতাকাঠামো নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যায়। নির্বাচনব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি, প্রশাসনিক পক্ষপাত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সঙ্কট কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলে নির্বাচনের ফল যতই গ্রহণযোগ্য দেখাক না কেন, বাস্তবে পরিবর্তন ঘটবে না।

এই দ্বন্দ্ব থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা জন্ম নিচ্ছে। একাংশ দ্রুত নির্বাচন চায়, আরেক অংশ আগে সংস্কার চায়- এই বিভাজনকে পুঁজি করে নানা স্বার্থান্বেষী শক্তি মাঠে নামতে পারে। নতুন বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই দুই চাপের মাঝখানে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি করা।

সমাধান নিহিত রয়েছে দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ সংস্কারে। কাগুজে রোডম্যাপ নয়, বরং নির্দিষ্ট আইন সংশোধন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ও জনসমক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই সংস্কার বিশ্বাসযোগ্য হবে। অন্যথায়, সময় ও গভীরতার এই দ্বন্দ্ব নতুন বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরো অনিশ্চিত করে তুলবে।

৩. অর্থনৈতিক সঙ্কট : সাধারণ মানুষের

জীবনে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা

অর্থনীতি নতুন বছরে সরকারের জন্য শুধু একটি নীতিগত চ্যালেঞ্জ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থার প্রশ্ন। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, কর্মসংস্থানের অভাব- সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের উপস্থিতি অনুভব করছে মূলত ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে।

বিশেষ করে তিনটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি নতুন বছরে বড় হয়ে উঠবে-

ক. মূল্যস্ফীতি ও আয় সঙ্কোচন : মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ কার্যত ‘জীবনযুদ্ধে’ নেমেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা রাজনৈতিক ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

খ. ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ : দীর্ঘদিনের লুটপাট ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা খেলাপি সংস্কৃতি অর্থনীতির ভিত নড়িয়ে দিয়েছে। এখানে সংস্কার মানে শুধু অর্থনৈতিক নয়- রাজনৈতিক সাহসের প্রশ্ন।

গ. বৈদেশিক ঋণ ও ডলার চাপ : বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ নতুন বছরে আরো বাড়বে। ভুল কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দেশকে আইএমএফ-নির্ভরতার ফাঁদে ফেলতে পারে।

৪. সামাজিক ক্ষত, বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায় : গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম, দমন-পীড়নের প্রশ্ন নতুন বছরে চাপা দিয়ে রাখা যাবে না। এটি শুধু অতীতের হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচরিত্র নির্ধারণের বিষয়।

বিচার না হলে তিনটি বিপদ তৈরি হবে- ১. রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সংস্কৃতি পুনরায় বৈধতা পাবে; ২. ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম বিচ্ছিন্নতায় পড়বে; ৩. রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নতুন করে জন্ম নেবে।

নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ হলো- প্রতিশোধমূলক নয়, কিন্তু কার্যকর ও দৃশ্যমান বিচার প্রক্রিয়া গড়ে তোলা।

৫. তরুণ সমাজ : আশার শক্তি না হতাশার আগুন?

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ। রাজপথে নেতৃত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়ান নির্মাণ এবং ভয়ভাঙা প্রতিবাদ- সব ক্ষেত্রেই তরুণরাই ছিল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। কিন্তু ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়, যেসব রাষ্ট্র বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, সেসব সমাজে আশার শক্তি দ্রুত হতাশার আগুনে রূপ নেয়।

নতুন বছরে বাংলাদেশের তরুণসমাজ তিনটি গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। প্রথমত, উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি এখন আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগ, বেসরকারি খাতে অনিশ্চয়তা এবং মেধার সঠিক মূল্যায়নের অভাব তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করছে। এই বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ-বিশ্বাসের সঙ্কট।

দ্বিতীয় সঙ্কট হলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অনিশ্চিত কাঠামো। গণ-অভ্যুত্থানে তরুণরা রাষ্ট্র পরিবর্তনের সাহস দেখালেও রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে তাদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গা তৈরি হয়নি। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নেতৃত্বের প্রশ্নে আবদ্ধ, আর বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে তরুণদের রাজনৈতিক শক্তি প্রান্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

তৃতীয়ত, রয়েছে আদর্শিক শূন্যতা ও বিভ্রান্তি। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে রাজনৈতিক শিক্ষা, মতাদর্শিক চর্চা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এর সুযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসমান আবেগ, চরমপন্থা ও গুজব তরুণদের একাংশকে বিভ্রান্ত করছে।

নতুন বছরে রাষ্ট্র যদি তরুণদের জন্য অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, টেকসই কর্মসংস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক সুযোগের পথ না খুলে দেয়, তবে এই বিশাল শক্তি রাষ্ট্রগঠনের সম্পদ না হয়ে রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। তরুণদের আশা রক্ষা করা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

৬. পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনৈতিক চাপ

নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও কৌশলগত, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পররাষ্ট্রনীতি ও তথ্যযুদ্ধ। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তরের এই সংবেদনশীল সময়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি বাংলাদেশমুখী, আর সেই দৃষ্টি সব সময় সহানুভূতিশীল নয়- বরং স্বার্থনির্ভর ও চাপসৃষ্টিকারী।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নতুন বছরে এক জটিল ভারসাম্যের রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থের সংযোগস্থলে অবস্থান করা বাংলাদেশ এখন আর কেবল উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক স্পেস। ফলে একটি পক্ষের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের সন্দেহ ও চাপ বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে নির্বাচন ও মানবাধিকার প্রশ্নে পশ্চিমা চাপ নতুন বছরে আরো জোরালো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখতে চায়- এটি নীতিগত হলেও এর সাথে কৌশলগত হিসাবও যুক্ত। এই চাপকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যেমন-ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অন্ধভাবে মেনে নেয়াও অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে সঙ্কট তৈরি করতে পারে।

অন্য দিকে ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হিসাব বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী বাস্তবতা। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং চীনের প্রভাব- সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী নয়, একটি কৌশলগত বাফার হিসেবেও দেখে। এই বাস্তবতায় সম্পর্ক রক্ষা জরুরি, কিন্তু অসম সম্পর্ক যেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে- সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।

একই সাথে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প খাতে গভীরভাবে যুক্ত। এই সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করলেও অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে কৌশলগত সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। নতুন বছরের চ্যালেঞ্জ হলো- চীনের বিনিয়োগকে কাজে লাগানো, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতিকে একমুখী না করা।

৭. তথ্যযুদ্ধ, গুজব ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

নতুন বছরে রাজনীতির বড় যুদ্ধ হবে তথ্যের মাঠে। সোশ্যাল মিডিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রপাগান্ডা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

চ্যালেঞ্জ হলো- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা, কিন্তু উসকানি ও সহিংস গুজব দমন করা; এখানে ব্যর্থতা মানে নতুন করে সহিংসতা ও বিভক্তি। এই আন্তর্জাতিক চাপের সমান্তরালে নতুন বছরে আরেকটি বড় যুদ্ধ চলবে- তথ্যের মাঠে। রাজনীতি এখন আর শুধু রাজপথ বা সংসদে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদমে সংঘটিত হচ্ছে। গুজব, ভুয়া ভিডিও, বিকৃত তথ্য ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রপাগান্ডা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

এখানে রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। এক দিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা- কারণ গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মতপ্রকাশ দমন মানেই রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ। অন্য দিকে উসকানি, সহিংস গুজব ও ঘৃণামূলক প্রপাগান্ডা দমন করা- যা সরাসরি সামাজিক শান্তি ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করতে পারে।

এই ভারসাম্যে ব্যর্থতা মানে শুধু ভুল নীতি নয়; এর অর্থ হতে পারে নতুন করে সহিংসতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা। সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে নতুন বছর বাংলাদেশকে কেবল একটি কৌশলগত রাষ্ট্র নয়, বরং একটি আত্মমর্যাদাশীল ও সচেতন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ দিতে পারে।

নতুন বছর, নতুন রাষ্ট্রচুক্তি

নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখার সুযোগ আর নেই। নির্বাচন, সংস্কার, অর্থনীতি, তরুণসমাজ, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা তথ্যযুদ্ধ- সবকিছু মিলিয়ে এগুলো একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে: এই রাষ্ট্র কার জন্য, কিভাবে পরিচালিত হবে এবং কোন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সেই প্রশ্নকে শুধু উচ্চারণই করেনি, রাষ্ট্রের সামনে তার উত্তর দেয়ার দায়ও চাপিয়ে দিয়েছে।

নতুন বছর সফল হবে না কেবল একটি নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। নির্বাচন প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়। একইভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বা বৈদেশিক রিজার্ভের পরিসংখ্যান বাড়লেও রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার অনুভূতি ফিরিয়ে দিতে না পারে, তবে সে সাফল্য হবে কাগুজে। গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে- অর্থনৈতিক সংখ্যার আড়ালে গণতন্ত্রের শূন্যতা ঢেকে রাখা যায় না।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি নতুন রাষ্ট্রচুক্তি নির্মাণ। যেখানে রাষ্ট্র আর শাসকের হাতিয়ার হবে না, বরং নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ক্ষমতার নয়, আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। যেখানে বিচার বিভাগ ভয়ের নয়, আস্থার জায়গা হবে। এই রাষ্ট্রচুক্তি কোনো একক আইনি নথি নয়; এটি রাজনৈতিক আচরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও নাগরিক- রাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বোঝাপড়া।

তরুণসমাজ এই নতুন রাষ্ট্রচুক্তির কেন্দ্রবিন্দু। তাদের রক্ত, সাহস ও স্বপ্নের বিনিময়ে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা যদি রাষ্ট্র রক্ষা করতে না পারে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়ারও সুযোগ থাকবে না। একই সাথে ভুক্তভোগী পরিবার, নিপীড়িত নাগরিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে নতুন রাষ্ট্রচুক্তি হবে অসম্পূর্ণ।

এই সুযোগ বারবার আসে না। ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কমই আসে, যখন একটি রাষ্ট্র নিজের পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ পায়। নতুন বছর হয়তো বাংলাদেশের জন্য তেমনই একটি শেষ বড় সুযোগ। ভুল সিদ্ধান্ত দেশকে আবার পুরনো অন্ধকারে ফিরিয়ে নিতে পারে। আর সঠিক সিদ্ধান্ত, সাহসী সংস্কার ও নৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশকে ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে যেখানে রাষ্ট্র ভয় নয়, ভরসার নাম হবে।