অমর একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করছে জাতি

১৯৫২ থেকে ২০২৬; মাতৃভাষার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির আত্মপরিচয় তৈরির লড়াকু ইতিহাসের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। বায়ান্নর এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সেই বীর শহীদদের প্রতি আজ পরম শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে জাতি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
দেশের আপামর জনতা আজ এ দিনটিকে ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে
দেশের আপামর জনতা আজ এ দিনটিকে ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে |ইন্টারনেট

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস। মাতৃভাষার জন্য আজ লড়াইয়ে নামার দিন, মাথা নত না করার দিন। দেশের আপামর জনতা আজ এ দিনটিকে ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে। সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে সারাবিশ্বে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

১৯৫২ থেকে ২০২৬; মাতৃভাষার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির আত্মপরিচয় তৈরির লড়াকু ইতিহাসের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। বায়ান্নর এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সেই বীর শহীদদের প্রতি আজ পরম শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে জাতি।

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শহীদ দিবসের কর্মসূচি শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিগণ, একুশে উদ্‌যাপন-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দফতর ও সংস্থার প্রতিনিধিগণ এবং রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এমন একতরফা ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলার ছাত্রসমাজ। সব বাধা উপেক্ষা করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই আত্মত্যাগই স্বাধীনতার বীজ বপন করে বাঙালির হৃদয়ে, যা পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা পায়।

আজ সরকারি ছুটি। শহীদ দিবস ‍উপলক্ষে বিশেষ বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শহীদ ‍দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘স্মৃতিবিজড়িত এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা শহীদদের। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’

মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। মূলত ভাষা আন্দোলন ছিল নিজস্ব জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন। আমাদের স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনাই যুগিয়েছে অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস।’

তিনি বলেন, ‘মহান একুশের চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত হোক, দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত হোক- মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ কামনা করি।’

অন্যদিকে, দেশবাসী ও বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় এবং গৌরবের প্রতীক। ৫২-র ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত করেছে। একুশের এই রক্তাক্ত পথ ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আমরা একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করি এবং বিশ্বের সকল বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সচেষ্ট হই।’

প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

শহীদ ‍দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

আজ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রয়েছে। জাতীয় কর্মসূচির সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ব স্ব কর্মসূচি পালন এবং সকল সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্‌যাপন করছে। সব সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেল একুশের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে; সংবাদপত্রসমূহে প্রকাশ হয়েছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। এছাড়া, ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি দিবসটি উপলক্ষে শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া ও কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের স্ব স্ব কর্মসূচি পালন করছে।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে একুশে বইমেলার আয়োজন করে থাকে। তবে এবার দেশে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একুশে বইমেলা শুরু হবে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি, যা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত।

সূত্র : ইউএনবি