কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল

বাংলাদেশের নির্বাচন স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য

দলটির মতে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত কোনো প্রভাব ফেলেনি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল
ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল |সংগৃহীত

কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বচ্ছ, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শনিবার (১৪ ফেব্রয়ারি) কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চেয়ারপারসন ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা অ্যাডো আকুফো-অ্যাডো বলেন, ‘নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য ছিল, পুরোটা সময় শান্তিপূর্ণ ছিল এবং স্বচ্ছ ছিল।’

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদের’ ওপর গণভোট পর্যবেক্ষণ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং মূলত স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি সারাদেশে ভোটগ্রহণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের জনগণ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশংসা করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আমন্ত্রণে আসতে পেরে কমনওয়েলথ সম্মানিত বোধ করছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বোচওয়ে ১৩ সদস্যের পর্যবেক্ষক দলটি গঠন করেন, যেখানে রাজনীতি, আইন, গণমাধ্যম, জেন্ডার এবং নির্বাচন প্রশাসনে অভিজ্ঞ বিভিন্ন কমনওয়েলথ অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

প্রতিনিধিদলটি ভোটের আগে বাংলাদেশের আটটি বিভাগে গিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ, প্রচারণা কার্যক্রম ও ভোটের দিন প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ ছিল, ভোটকেন্দ্রগুলো সময়মতো খোলা হয় এবং ভোটগ্রহণ পেশাদারিত্বের সাথে সম্পন্ন হয়। ভোটের উপকরণ যথাসময়ে বিতরণ করা হয় এবং কর্মকর্তারা নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে প্রস্তুতি নেন।

দলটির মতে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত কোনো প্রভাব ফেলেনি।

পর্যবেক্ষকরা আরো জানান, ভোটকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ভোটার তথ্য স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত ছিল, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক সারির ব্যবস্থা ছিল এবং অধিকাংশ কেন্দ্রে একাধিক লাইন ব্যবস্থাপনা ছিল।

তারা বিভিন্ন আসনে ভোটকেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত ফলাফল প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন এবং ডাকযোগে ভোটসহ ব্যালট গণনাকে স্বচ্ছ হিসেবে অভিহিত করেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমন্বিত ও কার্যকর ছিল। ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং তদারকি জোরদারে সিসিটিভি ও বডি-ওয়র্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়।

প্রবাসী ভোটার ও কারাবন্দিদের জন্য ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সম্প্রসারণকে ‘প্রশংসনীয় উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা আরো জোরদারে অতিরিক্ত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে বলে দলটি মত দেয়।

অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে পর্যবেক্ষক দলটি নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিকে প্রশংসা করে এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে।

তবে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র চার শতাংশ এবং মাত্র সাতজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অনলাইন হয়রানি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ও পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক কার্যক্রমে তরুণদের অংশগ্রহণ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে-উল্লেখ করা হলেও, আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি আরো বাড়ানো গেলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ শক্তিশালী হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মত দেন।

দলটি আরো জানায়, নির্বাচন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণ ভোটারদের সহায়তা করেছেন।

‘জুলাই সনদ’ গণভোট প্রসঙ্গে কমনওয়েলথ জানায়, এটি সংস্কারের জরুরি দাবির প্রেক্ষাপটে গৃহীত উদ্যোগ হলেও, প্রক্রিয়াটির পরামর্শমূলক গভীরতা ও যোগাযোগের স্পষ্টতা নিয়ে কিছু অংশীজন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে প্রাণবন্ত ও সক্রিয় হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয়, নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যাপক সংবাদ কভারেজ জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক আলোচনাকে শক্তিশালী করেছে।

দলটি নির্বাচনের পর কিছু বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার খবর স্বীকার করে এবং সকল অংশীজনকে শান্ত থাকার ও আইনসম্মত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানায়।

ভবিষ্যতের জন্য তারা নির্বাচন কমিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করার এবং পর্যবেক্ষক দলের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য দেশীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।

এছাড়া তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া গঠনেরও আহ্বান জানানো হয়।

আকুফো-অ্যাডো বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের চেষ্টা করেছেন।’ তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঐক্য ও উদারতার আহ্বান জানান।

কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি মহাসচিবের কাছে জমা দেয়া হবে, যাতে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ থাকবে। পরবর্তী সময়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় অংশীজনদের সাথে শেয়ার করা হবে। বাসস