জাতির উদ্দেশে ভাষণ

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ : প্রধান উপদেষ্টা

‘আমি আজ আমার কাজ থেকে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস |ফাইল ছবি

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মাদ ইউনূস বিদায়ী ভাষণে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ। যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল ভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে জনগণ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব- একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন হবে।

তিনি বলেন, আমি আজ আমার কাজ থেকে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন তাদেরকেও আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে। আগামী দিন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে-এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।

‘বিগত ১৮ মাস আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন শেষে, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য উপস্থিত হয়েছি।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আজ বিদায়ের দিনে ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে আপনাদের কিছু কথা বলব। কী মহা মুক্তির দিন ছিল সেদিনটি! সে কী আনন্দের দিন! বাংলাদেশীরা দেশে-বিদেশে যে যেখানে ছিল আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ সম্পূর্ণ অচল। অচল এই দেশটিকে কিভাবে সচল করা যাবে সেটা ছিল সবার মনে। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা ঠিক করলো দেশকে সচল করার জন্য একটি সরকার লাগবে। সরকার গঠন ও চালাবার জন্য তারা আমাকে খবর দিলো। আমি তখন বিদেশে। আমি দায়িত্ব নিতে রাজি না। তারা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বলে আমাকে রাজি করালো। ১৮ মাস পর এখন আমার যাওয়ার পালা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আজ আমার কাজ হতে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাতো। তাদের একান্ত অনুগত লোক নিয়ে অভ্যুত্থানের সাথে সাথে সবাই পালিয়েছে। বড় কর্তা পালিয়েছে। মাঝারি কর্তা পালিয়েছে। অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে। অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে।

‘কেউ নানাজনের সুপারিশ নিয়ে আসছে তারা অভ্যুত্থানের গোপন সৈনিক ইত্যাদি। সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেন না- এটি মহাসঙ্কট হয়ে দাঁড়াল। যতই লাশের, অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন দেহের সন্ধান আসছিল ততই তারা চিহ্নিত হচ্ছিল। সেই থেকে ১৮ মাস চলে গেছে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি এলো। দেড় যুগ পর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন এবং ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান হলো। এ নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ, দেশের সর্বত্র একটা ঈদের পরিবেশ ছিল যা আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

তিনি বলেন, চব্বিশের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মানুষ এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি উচ্চারণ করেছিল। সেই সময় দেশ একটি গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক সঙ্কটে নিপতিত ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল, গণতন্ত্র হয়েছিল ধুলিস্যাৎ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। ঠিক সেই সঙ্কটময় সময়ে আমাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল—একটি লক্ষ্য সামনে রেখে। বাংলাদেশকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।

তিনি আরো বলেন, আমি ও আমার সহকর্মীরা—সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকলো। আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। আমরা ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি—যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি, আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এ নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়— এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা; নতুন বাংলাদেশের জন্ম।