বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খন্ড) লিমিটেডের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে মর্মে বিগত অন্তর্বতী সরকার গঠিত জাতীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ওই চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অথবা আদানি পাওয়ারের সাথে আলোচনাক্রমে চুক্তিটি সংশোধন ইত্যাদি বিষয়সমূহ সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান মন্ত্রী।
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
সরকার আদানির সাথে করা চুক্তিটি পুনর্মূল্যয়নের জন্য এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- এমন প্রশ্নে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খন্ড) লিমিটেডের সাথে ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে চুক্তি হয়েছি ওই চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বতী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত একটি জাতীয় কমিটি কর্তৃক পর্যালোচনা করা হয়েছে। ওই কমিটিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন এবং কমিটি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণ করেছে। ওই পর্যালোচনায় আদানি পাওয়ারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে মর্মে জাতীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ওই চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশী আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অথবা আদানি পাওয়ারের সাথে আলোচনাক্রমে চুক্তিটি সংশোধন ইত্যাদি বিষয়সমূহ সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘাটতি নেই
দেশে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তবে গ্রীষ্মকালে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। ফলে ওই সময়ে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।’
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বিদ্যুতের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিং বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা সংসদে তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সাথে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাথমিক জ্বালানির চাহিদা মোকাবেলায় জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল ও নারায়ণগঞ্জের ৭৪টি মনোনীত ভোক্তার স্থাপনায় জ্বালানি নিরীক্ষা কার্যক্রম চলছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় এ কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক্ষক এবং ১৭৮ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গাড়ির দীর্ঘ সারি- মন্ত্রী কি দেখতে পাচ্ছেন না?
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী বলেছিলেন যে, কোনো জ্বালানি সংকট নেই। কী হচ্ছে? যারা তেল সংগ্রহ করতে যাচ্ছে তারা যথাযথভাবে তাদের স্বাভাবিক যে সার্ভিস সেটা পাচ্ছে না। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি গ্র্যাজুয়ালি পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজকে সিলেটের পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দেখছি যে রাস্তায় রাইডের গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং আমরা বারবার করে দেখতে পারছি যে সবাই প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, সরকার এই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। এই প্রবলেমটি অ্যাকনলেজ করার পরিবর্তে মন্ত্রী আগের মতো আমরা যেভাবে অ্যাভয়েড অফ প্রবলেম। প্রবলেম যেভাবে আমরা এড়িয়ে যেতাম মন্ত্রীদের মাধ্যমে এ ধরনের এক ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে তারা প্রবলেম অ্যাভয়েড করছে। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে প্রশ্ন, উনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং গ্র্যাজুয়ালি যে পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে, স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সেই জায়গাতে উনি কবে নাগাদ এই সমস্যাগুলোর যথাযথভাবে সমাধান দিবেন এবং উনি প্রবলেমটি অ্যাকনলেজ করবেন কি-না?
জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেয়ার কথা সেই পরিমাণ তেল আমাদের পাম্পগুলোতে সাপ্লাই করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে পেট্রোল পাম্পে যে পরিমাণ তেল দিতাম এক দিন, দেড় দিন লাগত বিক্রি হতে, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। সেইজন্য আপনার মানুষের যে প্যানিক বায়িংটা শুরু হয়েছে লাইন দেখা যায়। কিন্তু পেট্রোল সাপ্লাই হয় না এটা ঠিক না, পেট্রোল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।’
দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি, উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট
ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশের বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতার নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে সরকার। বর্তমানে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সচল রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, ‘দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেরই শক্তিশালী অংশগ্রহণ রয়েছে। বর্তমানে দেশে সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে ৬৪টি। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। সেইসাথে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ৬৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ১০ হাজার ৮৫৩ মেগাওয়াট। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানায় রয়েছে তিনটি বিশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ৬৮ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।’
মন্ত্রী জানান, সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত নির্ভর করে প্রতিদিনের চাহিদার ওপর। বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।



