অর্ধযুগের স্থবিরতা কাটিয়ে রাবিতে ১৫৪ শিক্ষক নিয়োগ

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভাইভা বোর্ডের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ শিক্ষক নিয়োগ। এরপর একে একে ৩৪টি বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয় ১৫৪ জন শিক্ষককে।

রাবি প্রতিনিধি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় |ফাইল ছবি

দীর্ঘ ছয় বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন সদ্য বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের শিক্ষক সঙ্কট নিরসনে ৩৪টি বিভাগে মোট ১৫৪ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের অ্যাকাডেমিক অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও নিয়োগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।

অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। নিয়োগ চলাকালীন স্বজনপ্রীতিসহ আরো কিছু অভিযোগ ওঠে। সে সময় নিয়োগ বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও অনশনের ঘটনাও ঘটে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সভাপতিরা এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। বিভাগীয় প্রধানদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতেই যোগ্যতম প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক মান বজায় রাখতে কোনো প্রকার আপস করা হয়নি বলেও তারা দাবি করেন।

এর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের মেয়ে ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২০ সালের ১০ ও ১৩ ডিসেম্বর পৃথক ১২টি নোটিশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এরপর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমুন্নত রাখার স্বার্থে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর জারি করা নিয়োগ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও নীতিমালা অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে সব নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অনুমতি দেয়া হয়। প্রথমবারের মতো চালু করা হয় লিখিত পরীক্ষা।

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভাইভা বোর্ডের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ শিক্ষক নিয়োগ। এরপর একে একে ৩৪টি বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয় ১৫৪ জন শিক্ষককে।

এরমধ্যে ইতিহাস বিভাগে সাতজন, ইংরেজি বিভাগে ছয়জন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে তিনজন, উর্দু বিভাগে তিনজন, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ছয়জন, গণিত বিভাগে চারজন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে সাতজন, রসায়ন বিভাগে চারজন, ফলিত গণিত বিভাগে চারজন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে সাতজন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগে আটজন, সমাজকর্ম বিভাগে আটজন, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে পাঁচজন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে চারজন নিয়োগ পায়।

এছাড়া ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে আটজন, ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগে তিনজন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে দু’জন, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিনিউকেশন ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে চারজন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে চারজন, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগে পাঁচজন, অর্থনীতি বিভাগে তিনজন, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে ছয়জন, নাট্যকলা বিভাগে তিনজন, ইনস্টিটিউট অব ইংলিশ অ্যান্ড আদার ল্যাঙ্গুয়েজেজ বিভাগে তিনজন, পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগে তিনজন, মনোবিজ্ঞান বিভাগে তিনজন, আরবী বিভাগে আটজন, পরিসংখ্যান বিভাগে চারজন, ফাইন্যান্স বিভাগে চারজন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে চারজন, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগে একজন, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে পাঁচজন, সঙ্গীত বিভাগে ‍দু’জন, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগে চারজনকে নিয়োগ দেয়া হয়।

নতুন শিক্ষক পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের শিক্ষক স্বল্পতার কারণে ক্লাস ও গবেষণায় যে ব্যাঘাত ঘটছিল, নতুন নিয়োগের ফলে তা দূর হবে বলে তারা আশাবাদী।

শিক্ষার্থীদের মতে, নতুন শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি আধুনিক ও মানসম্মত, যা তাদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

সব মিলিয়ে বিতর্ক থাকলেও, শিক্ষক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।