দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাব ও প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্টতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপপ্রচারকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ‘ভয়েস অব ইউনিভার্সিটি টিচাস’র বিশিষ্টজনেরা।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নগরীর দরগাহ গেটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের (কেমুসাস) সাহিত্য আসর কক্ষে ‘ভয়েস অব ইউনিভার্সিটি টিচার্স’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন-২০২৬: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: ইসমাইল হোসেন, পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ রাজিক মিয়া এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. মোহন মিয়া, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: রিজাউল ইসলামসহ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন শাবিপ্রবি’র স্কুল অব লাইফ সায়েন্সেস-এর সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অবাধ নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফলে সৃষ্ট ‘ডিপ স্টেট’ বা সুপ্ত রাজনৈতিক আনুগত্য এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতার অভাব সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়। জনআস্থা ফেরাতে হলে ইসিকে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সেমিনারে বক্তারা বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট রয়েছে। ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন বৈধতা দান, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিশেষ সুবিধা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ ইসির গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এছাড়া দেশের প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ভোটকেন্দ্র অনুপযোগী থাকা এবং নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য না থাকাও বড় শঙ্কার কারণ।
আসন্ন নির্বাচনে প্রযুক্তির অপব্যবহারকে ‘বড় হুমকি’ উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ‘এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ফেক ভিডিও-অডিও তৈরি, সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাকিং এবং অটোমেটেড বট ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হতে পারে। এর পাশাপাশি কালো টাকার ছড়াছড়ি, ভোট কেনাবেচা এবং মবক্রেসি নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।’
সামাজিক ও ধর্মীয় নিরাপত্তার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোচনায় বলা হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন স্থানে নারী কর্মীদের ওপর হামলা এবং বিশেষত মুসলিম নারীদের হিজাব ও নিকাব পরিধানকে কেন্দ্র করে হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সুযোগ-সন্ধানীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো: ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খা অনুযায়ী সাম্য ও ন্যায্যতাভিত্তিক দেশ গঠনে তরুণ, দল নিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক ভোটাররা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেছে নিবে। দেশের সংস্কার সাধনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠন করতে হবে। হ্যাঁ’ জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে। সে লক্ষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কোন গুজবে কান দেয়া যাবে না।’
সেমিনার থেকে সঙ্কট উত্তরণে সরকারের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম নিরাপত্তা জোরদার, নির্বাচনী আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।



