নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসেই কাটছে তাদের ঈদ

ক্যালেন্ডারের পাতায় উৎসবের লাল দিন। চারদিকে আনন্দের শোরগোল, নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার তাড়া। ঢাকার চিরচেনা যানজট ঠেলে সবাই যখন প্রিয়জনের কাছে পৌঁছাতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) যেন নেমে এসেছে নিরবতার ছায়া।

শেফাক মাহমুদ, বুটেক্স

Location :

Dhaka City
নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসেই কাটছে তাদের ঈদ
নিস্তব্ধ ক্যাম্পাসেই কাটছে তাদের ঈদ |নয়া দিগন্ত

ক্যালেন্ডারের পাতায় উৎসবের লাল দিন। চারদিকে আনন্দের শোরগোল, নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার তাড়া। ঢাকার চিরচেনা যানজট ঠেলে সবাই যখন প্রিয়জনের কাছে পৌঁছাতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) যেন নেমে এসেছে নিরবতার ছায়া। যে ক্যাম্পাসের করিডোর সারাবছর হাজারো শিক্ষার্থীর আড্ডা আর পদচারণায় মুখর থাকে, সেখানে এখন শুধুই পিনপতন নীরবতা। হলগুলো শূন্য, ল্যাবরেটরির দরজায় ঝুলছে তালা।

তবে এই নির্জনতার মাঝেও ক্যাম্পাসের প্রাণ স্পন্দন হয়ে জেগে আছেন একদল মানুষ। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও চারটি আবাসিক হলের নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নকর্মী, পাম্প অপারেটর ও ড্রাইভাররা। সবার কাছে তারা ভাই-মামা বা আঙ্কেল হিসেবেই পরিচিত। যখন সবাই পরিবারের সাথে আনন্দে মগ্ন, তখন বুটেক্সের নিরাপত্তা কর্মীরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে রাখছেন এই প্রিয় ক্যাম্পাসকে।

বুটেক্স ক্যাম্পাস, চারটি হল এবং আবাসিক এলাকাসহ ৪০ জনের মতো নিরাপত্তাকর্মী আছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী ছুটিতে আছেন এবং বাকিরা পালাক্রমে শিফট ভিত্তিক ডিউটি করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবাই একসাথে ছুটিতে যেতে পারেন না। এক ঈদে যারা বাসায় যান পরের ঈদে তাদের থাকতে হয় ক্যাম্পাসে। এই নিয়মকে মেনেই তারা নিজেদের মধ্যে ডিউটি ভাগ করে নিয়েছেন। যারা এবার ঈদে যেতে পারেননি তারা পরের ঈদে বাসায় যাওয়ার সুযোগ পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে দায়িত্বরত মো: জামাল ইসলাম নামের এক নিরাপত্তা কর্মীর সাথে কথা বলতেই ফুটে উঠলো এক মিশ্র অনুভূতি। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার সদর উপজেলায়। ফেলে আসা ঈদের স্মৃতি মনে করে তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় দাদার সাথে ঈদের কত স্মৃতি! দাদা আজ বেঁচে নেই। বড়দের কাছে সালামি পাওয়ার সেই আনন্দ এখনো মনে পড়ে। আমাদের গ্রামে ঈদের দিন খুব ধুমধাম হয়। ঢাকা বা বাইরে থেকে যারা বাড়ি ফেরে, সবাই মিলে খেলাধুলার আয়োজন করে। খুব মিস করছি সেইসব দিন।’

পরিবারের কথা তুলতেই তার কণ্ঠ কিছুটা ভারী হয়ে আসে। দেড় বছরের ছোট সন্তান, স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা-বাবাকে রেখে এই উৎসবে কর্মস্থলে থাকাটা সহজ নয়।

তিনি যোগ করেন, ‘আজ সকালে যখন ভিডিও কলে ছেলের মুখটা দেখছিলাম, খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু কী আর করার। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের কাউকে না কাউকে তো থাকতেই হয়। এটি আমাদের দায়িত্ব, আর আমরা সেটা হাসিমুখেই পালন করার চেষ্টা করি।’

তবে এই একাকীত্বের মাঝেও কিছুটা স্বস্তি খুজে নিয়েছেন তারা। ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) নির্দেশে এবার ঈদে বাড়িতে যেতে না পারা কর্মীদের জন্য দুপুরে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। সেই সাথে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঈদ বকশিশ ও উপহার পেয়ে তারা বেশ খুশি।

তাদের ভাষায়, ‘সবাই মিলে একসাথে খেতে পারব, এটা একটা পরিবারের মতো অনুভূতি দেয়। এতে মন খারাপটা কিছুটা হলেও কমে।’

ক্যাম্পাসের ভেতরের পকেট গেটে ডিউটি করছিলেন আরেকজন গার্ড সদস্য মো: আব্দুল হালিম। তার বাড়ি নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর জেলায়। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান আর নাতি-নাতনিরা পথ চেয়ে আছে তার জন্য।

তপ্ত দুপুরে টহল দিতে দিতে তিনি বলেন, ‘সবাই যদি ছুটিতে বাড়ি যায়, তবে এই বিশাল ক্যাম্পাস দেখাশোনা করবে কে? এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের কাধে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য আমরা শিফট ভাগ করে রাত-দিন ডিউটি করছি। বাড়ি যেতে না পারার আক্ষেপ থাকলেও, যখন স্যাররা এসে কুশল বিনিময় করেন বা বকশিস দেন, তখন মনে হয় আমরাও এই প্রতিষ্ঠানেরই অংশ।’

তিনি আরো জানান, এবার না যেতে পারলেও পরের ঈদে হয়তো পরিবারের সাথে ছুটি কাটাবেন। আপাতত বুটেক্সের এই গবেষণাগার, প্রশাসনিক ভবন আর সম্পদ রক্ষা করাই তার প্রধান কর্তব্য।

বুটেক্সের সবুজ চত্বরে যখন ঈদের চাঁদ ওঠে, তখন এই মানুষগুলোর উৎসব সীমাবদ্ধ থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে পরিবারের হাসিমুখ দেখে। তাদের এই ত্যাগের বিনিময়েই নিশ্চিন্তে ঘুমান ছুটিতে থাকা শিক্ষার্থীরা, আর নিরাপদ থাকে প্রিয় ক্যাম্পাস। পোশাকের জৌলুস বা পদের বড়াই নেই, কিন্তু দায়িত্ব পালনের এই নিষ্ঠাই তাদের করে তুলেছে ক্যাম্পাসের আসল 'গার্ডিয়ান'। সবার ঈদ যখন শেষ হয়ে আসবে, শিক্ষার্থীরা যখন আবার ক্যাম্পাসে ফিরবেন তারা হয়তো জানবেনও না, এই কয়েকটা দিন তাদের প্রিয় ক্যাম্পাসকে কারা নিজের জীবনের চেয়েও বেশি যত্ন দিয়ে আগলে রেখেছিলেন।