ঈদ এদেশের মুসলমানদের জন্য আনন্দ, মিলন ও উদযাপনের অন্যতম বড় উৎসব। প্রতি বছর ঈদ এলেই মানুষের মনে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে যায়। প্রিয়জনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সবাই মুখিয়ে থাকেন। তাই যারা পরিবার থেকে দূরে থাকেন, তারা নাড়ির টানে ছুটে যান নিজের ঘরে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাদের অনেককেই পরিবার, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থাকতে হয়। সারা বছর ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট ও টিউশনের ব্যস্ততায় বাড়ি ফেরা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি সেই সুযোগ এনে দেয়। এই সময় শিক্ষার্থীরা পরিবারের কাছে ফিরে যান, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান এবং প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার বিশেষ উপলক্ষ্য।
ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বুটেক্সের ৫০তম ব্যাচের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হোসনে আকরাম সোহান বলেন, ‘পড়াশোনা ও ব্যস্ততার কারণে বছরের বেশিভাগ সময়ই পরিবার থেকে দূরে ঢাকায় থাকতে হয়। তাই ঈদ সামনে এলেই বাড়ি ফেরার অনুভূতিটা অন্যরকম আনন্দ নিয়ে আসে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঈদের আগে থেকেই মনে হয় আর কয়েকদিন পরই পরিবারের সবার সাথে দেখা হবে। মা-বাবা ও পরিবারের সবার সাথে সময় কাটানোর অপেক্ষাটা সত্যিই অন্যরকম। অনেকদিন পর বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের যাত্রাটাও তখন খুব আনন্দের মনে হয়। ঈদের দিন সকালে পরিবারের সবার সাথে নামাজ পড়তে যাওয়া, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করা এবং আত্মীয়দের সাথে দেখা করা- এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে যেটা পাওয়া যায় না, ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলে সেই পারিবারিক সম্প্রীতি ও ভালোবাসা আবার অনুভব করা যায়।’
বুটেক্সের ৫১তম ব্যাচের টেক্সটাইল ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো: আরাফাত আহাম্মদ খান বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা আমার ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। যত ব্যস্ততাই থাকুক, মনে মনে দিন গুনতে থাকি কখন পরিবারের কাছে ফিরব। শহরের জীবনটা অনেক সময় খুব যান্ত্রিক মনে হয়। মানুষ পাশাপাশি থাকলেও যেন একে অপরের খোঁজ নেয়ার সময় পায় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই গ্রামে বড় হয়েছি। নবম শ্রেণি থেকে ঢাকায় থাকলেও এখনো মনে হয় সুযোগ পেলে সব ছেড়ে আবার সেই গ্রামেই ফিরে যাই। ঈদের দিন গ্রামের চাচা, ভাই ও বড়দের সাথে দেখা হয়। সবাই মিলে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাই। পুরো গ্রাম যেন এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়। নামাজ শেষে গোরস্থানে গিয়ে দাদা-দাদীর কবর জিয়ারত করি। আমার কাছে ঈদের ছুটি মানেই আমার গ্রাম, স্মৃতি আর শিকড়ের সাথে আবার নতুন করে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।’
একই ব্যাচের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো: আছিম হোসেন রাসেল বলেন, ‘ঈদের সময় মনটা আগে আগে গ্রামে ছুটে যায়। টিকিট কাটার পর থেকেই শুরু হয় অপেক্ষার দিন-গোনা। হলের রুমে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে মনে পড়ে গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানের মাঠ আর সন্ধ্যার আজানের সুর। ট্রেন বা বাসের দীর্ঘ যাত্রা তখন আর ক্লান্তিকর মনে হয় না। কারণ জানি, গন্তব্যে আছে আমার পরিবার, আমার শেকড়।’
তিনি আরো বলেন, ‘দূর থেকে বাড়ির টিনের ছাউনি বা উঠানের গাছগুলো চোখে পড়লেই বুকটা ভরে যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে মায়ের হাসিমাখা মুখ দেখা, বাবার স্নেহময় কণ্ঠে খোঁজ নেয়া, এই মুহূর্তগুলোই যেন সারা বছরের প্রাপ্তি।’
৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাশফিক নিয়াজ বলেন, ‘শহরের কোলাহল ও ব্যস্ততা ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসা এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। বাড়ির আঙিনায় মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণ, বাবা-মায়ের স্নেহ, ভাই-বোনদের সাথে গল্প, সব মিলিয়ে ঈদ যেন নতুন করে জীবনকে ছুঁয়ে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঈদ শুধু নতুন পোশাক বা উপহারের আনন্দ নয়। এটি এমন একটি অনুভূতি, যা পরিবারের সাথে থাকলেই সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করা যায়। ঈদে বাড়ি ফেরা যেন নিজের শিকড়ের সাথে আবার নতুন করে সংযোগ স্থাপন করার মতো।’



