সবুজ ধানের মাঠ যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত ক্যানভাস। সেখানে চোখ রাখলেই ভেসে ওঠে মহান স্বাধীনতার স্মারক ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধের’ অবয়ব। আর এই ব্যতিক্রমী শিল্পকর্মের কারিগর একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক।
কুড়িগ্রামের উলিপুরে এমনি এক সবুজ ধানের মাঠ চোখে পড়ে। যেখানে এক স্কুলশিক্ষকের সৃজনশীলতা ফুটে উঠেছে।
উলিপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাফর সাদিক আবারো আলোচনায়, তবে এবার ভিন্ন এক কারণে। বেগুনি রঙের বিশেষ ধানের চারা ব্যবহার করে তিনি তার ক্ষেতজুড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা। আগে একইভাবে তিনি ধানক্ষেতে এঁকেছেন জাতীয় ফুল, পতাকা ও বাংলাদেশের মানচিত্র, প্রতিবারই চমকে দিয়েছেন এলাকাবাসীকে।
চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ১৭ বিঘা জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করছেন তিনি। এর মধ্যেই ব্রি ধান-১১৩ এর একটি খণ্ড জমিকে বেছে নিয়ে সেখানে সৃষ্টি করেছেন এই অনন্য নকশা। কৃষির সাথে সৃজনশীলতার এমন মেলবন্ধন শুধু এলাকায় নয়, পুরা দেশে বিরলই বলা চলে।
শিক্ষকতা তার পেশা হলেও কৃষির প্রতি রয়েছে গভীর টান। নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি নিজ জমিতে চাষাবাদ করে চলেছেন তিনি। তবে এবার তার কাজ যেন কেবল কৃষিকাজে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠেছে দেশপ্রেম জাগানোর এক অভিনব প্রয়াস।
দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এই দৃশ্য দেখতে। প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা। পথচারীরা থেমে মোবাইলফোনের ক্যামেরায় বন্দি করছেন স্মৃতিসৌধের এই সবুজ সংস্করণ।
এসএসসি পরীক্ষার্থী আকিব হাসান, শরিফ উদ্দিন ও আমিনুল ইসলাম জানায়, শুনে অনেক দূর থেকে এসেছি। দেখে খুব ভালো লাগছে। এর মাধ্যমে আমরা ’৭১-এর ইতিহাস নতুনভাবে অনুভব করতে পারছি।
স্থানীয় আলামিন মিয়া বলেন, একজন শিক্ষক হয়ে এভাবে কৃষিতে নতুন কিছু করা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি আমাদের এলাকার গর্ব।
নিজের কাজের পেছনের ভাবনা জানাতে গিয়ে জাফর সাদিক বলেন, ‘শিক্ষকতা আমার পেশা, কৃষি আমার নেশা, আর দেশপ্রেম আমার বিশ্বাস। সেই জায়গা থেকেই কৃষিক্ষেত্রকে আমি দেশপ্রেম শেখানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছি। বইয়ে যেমন ইতিহাস শেখাই, তেমনি মাঠে সেই ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে তুলি।’
উলিপুর-রাজারহাট সড়কের পাশে তার এই ধানক্ষেত এখন যেন এক খোলা জাদুঘর। প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। আর মানুষের এই আগ্রহই তাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে।
জাফর সাদিকের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, দেশপ্রেম প্রকাশের জন্য বড় মঞ্চের প্রয়োজন হয় না। সৃজনশীল মন আর ভালোবাসা থাকলেই সাধারণ একটি ধানক্ষেতও হয়ে উঠতে পারে জাতির গর্বের প্রতীক।



