ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ধীরে ধীরে রোগী ভর্তি হতে শুরু করে। ১৭ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮১ শিশু ভর্তি হয়েছে, বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ৬৭ জন। তিন মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ছয়মাস থেকে এক বছরের শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরমধ্যে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
টিকার চাহিদা ও সরবরাহ:
ময়মনসিংহে এম আর (হামের) টিকার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হলেও পুরোপুরি দেয়া সম্ভব হয়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২১ হাজার ভায়ালের চাহিদা থাকলেও মাত্র ১৯ হাজার ভায়াল সরবরাহ হয়েছে। ফলে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর টিকা বাকি রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীরা টিকা সঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
জনবল ও কর্মবিরতির প্রভাব:
জেলায় ৭১১ জন স্বাস্থ্য সহকারী প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ৪৮০ জন কর্মরত। বাকি ২৩১ পদ শূন্য। গতবছর বিভিন্ন দাবিতে তিন দফায় কর্মবিরতি থাকায় টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুরা সময়মতো টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
অসচেতন অভিভাবক ও সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা:
প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক অভিভাবক এখনো শিশুকে টিকা দিতে চান না। এছাড়া টিকার সঠিক সংরক্ষণ, ডোজ মাপ ও মেয়াদ সীমিত হওয়ার কারণে কিছু টিকা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, টিকা ঠিক সময়ে পৌঁছে দিতে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে মমেক হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। তিনটি মেডিক্যাল টিম শিশুদের চিকিৎসা দিচ্ছে। শিশুদের নেবুলাইজ, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসরা জানায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮২ শতাংশ ময়মনসিংহের। ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়, বিশেষ করে হাঁচি-কাশি ও সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে। নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হওয়ার কারণ হতে পারে মায়ের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না পাওয়া বা বুকের দুধ কম পাওয়া। এর কারণ নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকা সরবরাহ, জনবল বৃদ্ধি ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধিই হামের বিস্তার রোধের মূল চাবিকাঠি। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত বৈঠক ও পর্যবেক্ষণ চলছে, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, ‘জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী (মাঠকর্মী) নেই। প্রায় ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারী না থাকায় একটু জটিলতা রয়েছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বর্তমানে হাম আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি করে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
হাসপাতালের হাম মেডিক্যাল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক মো: গোলাম মাওলা বলেন, ‘হামের টিকা নিয়েছে ও নেয়নি, দুই ধরনের রোগী ভর্তি হচ্ছে। শিশুরা হামের পাশাপাশি জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে সর্বনিম্ন তিন মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে ছয় মাস থেকে এক বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।’
তিনি আরো বলেন, ‘হামের লক্ষ্মণ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুর নাক থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) পাঠাই। সেখান থেকে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল দেয়া হয়।’



