গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন

ভাঙা ফুটওভার ব্রিজে মৃত্যুঝুঁকি, বন্ধ লোকাল ট্রেন

কিশোর গ্যাং ও কালোবাজারিতে অতিষ্ঠ যাত্রীরা

‘প্রতিদিন এতো মানুষ এই ব্রিজ দিয়ে পার হয়, অথচ কেউ মেরামতের উদ্যোগ নেয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে তখন হয়তো কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে।’

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Gauripur
গৌরীপুর জংশন স্টেশনে ভাঙা, জরাজীর্ণ রেলওয়ে ফুটওভার ব্রিজ
গৌরীপুর জংশন স্টেশনে ভাঙা, জরাজীর্ণ রেলওয়ে ফুটওভার ব্রিজ |নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন গৌরীপুর এখন অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় উত্তরাঞ্চল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের যাত্রী চলাচলের অন্যতম ব্যস্ত কেন্দ্র ছিল এই স্টেশন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও তদারকির অভাবে স্টেশনটি এখন জরাজীর্ণ অবকাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে কার্যত এক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী এই জংশন।

ভাঙা ফুটওভার ব্রিজে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি :
স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন স্থানে কংক্রিটের স্ল্যাব খসে পড়েছে, বেরিয়ে এসেছে লোহার রড। কোথাও কোথাও বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন শত শত যাত্রী বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ ব্যবহার করছেন।

স্থানীয় যাত্রী আব্দুল কাদের বলেন, ‘ব্রিজে উঠলেই ভয় লাগে। অনেক জায়গায় সিমেন্ট উঠে গেছে, রড বের হয়ে আছে। কখন যে বড় দুর্ঘটনা ঘটবে বলা যায় না।’

আরেক যাত্রী রাশেদা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন এতো মানুষ এই ব্রিজ দিয়ে পার হয়, অথচ কেউ মেরামতের উদ্যোগ নেয় না। দুর্ঘটনা ঘটলে তখন হয়তো কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে।’

বন্ধ লোকাল ট্রেনে দুর্ভোগ :
একসময় গৌরীপুর জংশন দিয়ে ময়মনসিংহ, ভৈরব, জামালপুর ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন রুটে একাধিক লোকাল ট্রেন চলাচল করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব ট্রেনের বেশ কয়েকটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগে লোকাল ট্রেনে মালামাল আনা-নেয়া করতাম। এখন ট্রেন বন্ধ থাকায় বাসে যেতে হয়, খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’

স্টেশনজুড়ে ময়লা, নিরাপত্তাহীনতা :
স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের পরিবেশও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ময়লা-আবর্জনার স্তূপ ও দুর্গন্ধে অনেক সময় প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়ে।

এছাড়া স্টেশন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের আড্ডা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অনেক সময় যাত্রীদের সাথে অসদাচরণ ও হয়রানির ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ :
গৌরীপুর জংশনে টিকিট কালোবাজারিও এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে টিকিট কিনছেন বলে জানিয়েছেন।

প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর যাতায়াত :
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী এই স্টেশন ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই তুলনায় স্টেশনের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্টেশনের কিছু সমস্যার বিষয় আমাদের নজরে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

এদি‌কে গৌরীপুর থে‌কে নির্বা‌চিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও বর্তমান দু‌র্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয়রা কয়েকটি দাবি জানিয়েছেন।

দাবিগু‌লো হ‌লো— জরাজীর্ণ ফুটওভার ব্রিজ দ্রুত মেরামত বা পুনর্নির্মাণ, বন্ধ লোকাল ট্রেন পুনরায় চালু, স্টেশনে নিরাপত্তা জোরদার করে কিশোর গ্যাং ও টিকিট কালোবাজারি বন্ধ, স্টেশন এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও যাত্রীবান্ধব করা।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের অস্তিত্বই এক সময় হুমকির মুখে পড়তে পারে।