মিরসরাইয়ে বিপিসির পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরি, তদন্ত কমিটি গঠন

থানায় মামলা, আটক ১

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জাতীয় তেল সরবরাহ পাইপলাইন ফুটো করে অভিনব কায়দায় কয়েক হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে উপজেলার হাদিফকিরহাটে জানাজানি হয়।

এম মাঈন উদ্দিন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

Location :

Mirsharai
মিরসরাইয়ে বিপিসির পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরি, তদন্ত কমিটি গঠন
মিরসরাইয়ে বিপিসির পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরি, তদন্ত কমিটি গঠন |নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জাতীয় তেল সরবরাহ পাইপলাইন ফুটো করে অভিনব কায়দায় কয়েক হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনাটি বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে উপজেলার হাদিফকিরহাটে জানাজানি হয়।

পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি ও চুরি হওয়া তেলের পরিমাণ নিরূপণে বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে তেল চুরির ঘটনায় বিপিসির ডিজিএম প্রশাসন (অর্থ) মাহবুবুর রহমান বাদি হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪/৫ জনের নামে মিরসরাই থানায় একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় ঘরের মালিক আবছারকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হাদিফকিরহাটে পাইপলাইনের ওপর একটি অস্থায়ী টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে এই চুরি চলছিল। গতকাল সকালে পাইপলাইনে তেলের চাপ বেড়ে যাওয়ায় চোরাই সংযোগটি ফেটে যায় এবং আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন হাঁড়িপাতিল ও বালতি নিয়ে তেল সংগ্রহ শুরু করলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

খবর পেয়ে মিরসরাই থানার পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিপিসি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ওই অংশ সিলগালা করে দেয়। ঠিক কি পরিমাণ তেল চুরি করা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

তবে আগে লোপাট করা তেলের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সংঘবদ্ধ চক্র এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তা নিয়েও চলছে জল্পনা কল্পনা।

সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহের পেট্রোলিয়াম পাইপ লাইন নির্মাণের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপ লাইনটিতে ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়েছে। নৌপথে তেলবাহী ট্যাংকারে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত তেল পরিবহনে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪ ঘণ্টায় তেল পৌঁছানো সম্ভব হয়। কিন্তু অত্যাধুনিক সেই পাইপ লাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা নানা প্রশ্নেরও সৃষ্টি করেছে।

মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ ফরিদা ইয়াসমিন জানান, তেল চুরির ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় এজাহারনামীয় আসামি ঘরের মালিককে আটক করে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ঘটনাটি এলাকার পাশাপাশি পেট্রোলিয়াম সেক্টরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এতো সুরক্ষিত একটি পাইপলাইন এভাবে কেটে তেল বের করে নেয়ার ঘটনাটিকে সহজভাবে দেখা উচিত হবে না মন্তব্য করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি স্রেফ বোকামি করে তেল চুরির ঘটনা নাকি সংঘবদ্ধ কোনো চক্রের কারসাজি তা খতিয়ে দেখা দরকার। ডিপোগুলো থেকে ইতোপূর্বে লুট হওয়া কয়েক লাখ লিটার তেলের সাথে অভিনব পন্থার এই তেল চুরির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে না দেখলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

প্রসঙ্গত, দেশের চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানির বেশিরভাগই বেসরকারি অয়েল ট্যাংকারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। যেখানে কোটি কোটি টাকার তেল চুরিসহ নানা ধরনের অপকর্ম ঘটে। ট্যাংকারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে পয়েন্ট ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নেয়। বছর শেষে এই পয়েন্ট ১৭ শতাংশ বিশাল অংক হয়ে দাঁড়ায়। সিস্টেম লস কিংবা তেল চুরির এই বিশাল লোকসান থেকে দেশের জ্বালানি তেল সেক্টরকে বাঁচাতেই মূলতঃ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপ লাইন নির্মাণ করা হয়। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপ লাইনে বর্তমানে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেয়া হবে। জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং চট্টগ্রাম থেকে গোদনাইলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিস্টেম লস শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

গত ১৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে এই পাইপ লাইন ব্যবহার করে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। এই পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বারুড়া হয়ে জ্বালানি তেল নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায় পৌঁছায়। কুমিল্লার বরুড়ায় রয়েছে এই পাইপ লাইনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে। তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ সবই পরিচালিত হয় কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। ম্যানুয়ালি কোনো কাজই হয় না। চট্টগ্রামের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই পুরো পাইপ লাইনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হয়। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন এবং লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপ লাইনের সাথে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে। ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপ লাইনের ২৪১ কিলোমিটার অংশে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে, যা পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি, গোদনাইল থেকে ফতুল্লায় ডিপো পর্যন্ত ৮.২৯ কিলোমিটার পৃথক ১০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ভূ–গর্ভস্থ এই পাইপ লাইন ২২টি নদী ও খালের নিচ দিয়ে এসেছে এবং পুরো রুটে মোট ৯টি পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ট্যাংকারে তেল পরিবহনে বিপিসির বার্ষিক খরচ হতো প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা। পাইপ লাইনে তেল সরবরাহে খরচ মাত্র ৯০ কোটি টাকা। এতে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বিপিসির। এছাড়া সিস্টেম লস এবং চুরি ঠেকানোর মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা রক্ষা পাবে বলেও উদ্বোধনের সময় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। আর বলা হয়েছিল, অত্যাধুনিক এই পাইপ লাইনে কোনো ধরনের চুরির সুযোগ নেই