অনশনেও নড়েনি প্রশাসন, নীল দলের সদস্যের ছায়ায় অনিশ্চিত ব্রাকসু!

‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ (ব্রাকসু) নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু টালবাহানাই করে যাচ্ছে। একের পর এক তারিখ ঘোষিত হচ্ছে আর সেগুলো নাই করে দিচ্ছে। শহীদ আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে বসা প্রশাসন এখন নয়া ক্ষমতার গন্ধ অন্বেষণে দিশেহারা। এদিকে ঢাকার বাইরে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রাণের এই দাবিটি বাস্তবায়নে ডাকসু কিংবা অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররাও কথা বলছেন না। কোনো টালবাহানা না করে নির্ধারিত সময়েই ব্রাকসু নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।’

তাওহীদুল হক সিয়াম, বেরোবি
অনিশ্চিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন
অনিশ্চিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন |ফাইল ছবি

শিক্ষার্থীদের অনশন, অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন উপেক্ষা করে প্রশাসনের ধারাবাহিক টালবাহানা, বারবার দায়িত্বপ্রাপ্তদের পদত্যাগ ও নিরাপত্তা অজুহাতে ব্রাকসু নির্বাচন এখন চরম অনিশ্চয়তায়।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) নীল দলের সাবেক সদস্য ও ব্রাকসুর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাসুদ রানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে ব্রাকসুর নির্বাচন কমিশন জানান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর-এর কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন-২০২৫ অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনী পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রমকে যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দিকনির্দেশনার আলোকে দেশের সকল পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের সকল প্রকার নির্বাচন, বণিক সমিতির নির্বাচন, সমবায় সমিতির নির্বাচন, ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচনসহ সকল সংগঠনের নির্বাচন আয়োজন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

উক্ত নির্দেশনা জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় আইনগত বাধ্যবাধকতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার স্বার্থে প্রণীত হওয়ায়, উহার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন এবং অনুসরণ করা সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য আবশ্যক। অতএব, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়, রংপুর থেকে পাঠানো পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর-এর ব্রাকসু ও হল শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন-২০২৫ সংক্রান্ত চলমান সকল নির্বাচনী কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হলো।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর এবং প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনার আলোকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরবর্তী সময়ে নতুন তফসিল প্রণয়ন ও নির্বাচনী কার্যক্রম পুনরায় আরম্ভ করা সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে যথাসময়ে অবহিত করা হবে।

অন্যদিকে গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘ব্রাকসু ও শাকসুর নির্বাচন নিয়ে ইসি নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ব্রাকসু ও শাকসু নির্বাচনে সহযোগিতা করবে ইসি।’

তবে অবস্থান পরিবর্তন করেননি ব্রাকসুর নির্বাচন কমিশন। এদিকে পঞ্চম বারের মত ব্রাকসুর তফসিল স্থগিত ঘোষণার পর এমন সিদ্ধান্তে কড়া সমালোচনা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিশ্ববদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি এইচ এম সুমন সরকার বলেন, ‘বেরোবির দুঃখ মিস্টার মাসুদ গং! ব্রাকসু বানচালের মূল হোতা। বেরোবিয়ানরা এখনো চিনল না ফ্যাসিস্টের দোসরদের। নির্বাচন স্থগিত করার জন্যই তাকে পরিকল্পিতভাবে দায়িত্ব দেয়া হলো। মাসুদ সাহেব ছিলেন শহীদ আবু সাইদসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলাকারী মশিউরদের সহযোগী। যিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্বাচনী প্রচারণাও অংশগ্রহণ করতেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘হায় আফসোস! জুলাই বিপ্লবের সিপাহসালার শহীদ আবু সাঈদ ভাইয়ের রক্তের ওপর দাড়িয়ে ভিসি হয়ে আসলেন প্রফেসর শওকাত আলী। যিনি শিক্ষার্থীদের পালস তো বোঝার চেষ্টা করলেনই না, উপরন্তু ফ্যাসিস্টদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। তাবেদারি শুরু করলেন একটি দলের। আদর্শগত বিশ্বাস থাকতে পারে, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস মারাত্মক! মনে রাখবেন এটা শহীদ আবু সাইদের ক্যাম্পাস। এ পর্যন্ত পাঁচবার তফসিল পরিবর্তন করেছেন। নির্বাচন যদি নাই দিবেন তাহলে এ সকল নাটক কেন করলেন? শিক্ষার্থীদের অনশন, সময়, শ্রম, ফর্মের টাকা, ডোপটেস্টসহ কত অপচয়! ধিক্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষক নামক ওই সকল মেরুদণ্ডহীন প্রাণীদের যারা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় না করে একটি গোষ্ঠীর অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমেছেন। শিক্ষার্থীরা আপনাদের হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দিবেন।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম সংগ্রাম লিখেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ (ব্রাকসু) নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু টালবাহানাই করে যাচ্ছে। একের পর এক তারিখ ঘোষিত হচ্ছে আর সেগুলো নাই করে দিচ্ছে। শহীদ আবু সাঈদের রক্তের বিনিময়ে বসা প্রশাসন এখন নয়া ক্ষমতার গন্ধ অন্বেষণে দিশেহারা। এদিকে ঢাকার বাইরে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রাণের এই দাবিটি বাস্তবায়নে ডাকসু কিংবা অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররাও কথা বলছেন না। কোনো টালবাহানা না করে নির্ধারিত সময়েই ব্রাকসু নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।’

এই বিষয়ে ব্রাকসুর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাসুদ রানা বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রমকে যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দিকনির্দেশনার কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রংপুর রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর একটা আবেদন দিবো দিকনির্দেশনা চেয়ে। ওনি যদি দিকনির্দেশনা দেন, সেটার ওপর ভিত্তি করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করব।’