ঈদের ছুটিতে স্বল্প খরচে ঘুরে আসতে পারেন সাদা পাহাড়, চন্দ্রডিঙ্গা ও লেঙ্গুরায়

একদিনেই সব স্পট ঘুরে দেখা সম্ভব

উপরে উঠার পর বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি গারো পাহাড় আর ইউটার্ন নদীর অপরূপ মনোরম ভিউ দেখতে পাবেন। আর বুক ভরে সতেজ বিশুদ্ধ নিশ্বাস নিতে পারবেন।

ফজলুল হক রোমান, নেত্রকোনা

Location :

Netrokona
নেত্রকোনার প্রাকৃতিক ভ্রমণ সাইট, ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বেস্ট অপশন
নেত্রকোনার প্রাকৃতিক ভ্রমণ সাইট, ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বেস্ট অপশন |নয়া দিগন্ত

পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ভ্রমন পিপাসুরা ভাবছেন কোথায় যাবেন এবার। এখনো হয়তো অনেকে ঠিক করে উঠতে পারছেন না। তাদের জন্য রয়েছে স্বল্প খরচে পছন্দের যায়গা মেঘালয় রাজ্যের সন্নিকটে দু’চোখ জুড়ানো বাংলাদেশের একমাত্র সাদা পাহাড়।

এর অবস্থান নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী সুসং দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বিজয়পুর নামক স্থানে। এছাড়া পাশের উপজেলা কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষা চন্দ্রডিঙ্গা, পাতলাবন ও লেঙ্গুরায় সাত শহীদের মাজার।

পর্যটন এলাকার অন্তর্ভুক্ত কোলাহলমুক্ত শান্ত, নিবির, নির্মল পরিবেশ অনন্য অপরূপ মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মূহুর্তে পথের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে মনে বয়ে যাবে এক প্রশান্তির পরশ। যেকেউ সহজেই বিমোহিত হতে পারেন সহজেই। আমাদের দেশে অন্য জেলায়ও পাহাড় রয়েছে কিন্তু এখানকার সীমান্তঘেঁষা রহস্যময় পাহাড়ের অন্যরকম এক আকর্ষণ রয়েছে। মন হরণ করা হাতছানি যা সহজে ভোলার মতো নয়।

একদিনের এই ভ্রমনটি জীবনের পড়ন্ত বেলায় একাকিত্ব সময়ে স্মৃতির ক্যানভাসে হয়ে উঠতে পারে আনন্দ ও প্রশান্তির খোরাক। সাদা পাহাড় বা চীনা মাটির পাহাড় বলা হলেও এর রয়েছে অনেকরূপ। যেমন সাদা, কোথাও গোলাপী, আবার বেগুনী। এই পাহাড়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর খাদ বা লেক। যার টলটলে পানি কোথাও নীল আবার কোথাও সবুজ বর্ণের।

অনেকে মনের আনন্দে সাঁতার কাটেন লেকের স্বচ্ছ টলটলে পানিতে। তপ্ত রোদে মন-প্রাণ জুড়িয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। কেউ কেউ মনের আনন্দে ডিঙ্গি নৌকায় ঘুরে বেড়ান। আবার কেউ বা ঘোড়ায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করেন সেখানে।

এই সাদা পাহাড়টি এক বিশাল প্রাকৃতিক খনিজ সম্পাদ। দেশের সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে এই মাটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর উত্তর পাশে বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পের ঢালে বয়ে গেছে গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা বহমান সোমেশ্বরী পাহাড়ি নদী। সেখানে ভাড়ায় চালিত নৌকায় করে জিরো পয়েন্টে মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবেন।

বিজয়পুরের আরো দু’টি স্পট দেখতে পারেন। তা হলো— কিংবদন্তি হাজং মাতার স্মৃতিসৌধ ও টিলার উপরে রানী খং গীর্জা। এছাড়া সুসং জমিদার বাড়ি, গারো, হাজং পল্লী ও বিরিশিরিতে উপজাতি কালচার অ্যাকাডেমি।

দুর্গাপুরের পাশের কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাওয়ের চন্দ্রডিঙ্গায় দেখতে পাবেন এক অনন্য সুন্দর গারো পাহাড়। চন্দ্রডিঙ্গায় এক বৃহৎ বটবৃক্ষের পাশে পাথুরি পাহাড়ের গায়ে অঙ্কিত রয়েছে নৌকা ও মস্তুল। উপজাতিদের বিশ্বাস আদি যুগে দেবদেবীদের চলন্ত এই নৌকাটি অলৌকিকভাবে পাহাড়ের সাথে আটকে গিয়েছিল। এই বিশ্বাস থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময় তারা সেখানে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। সবুজ, সতেজ, অনিন্দ সুন্দর প্রাকৃতিক এই পরিবেশে হারিয়ে যেতে উদাস হয়ে উঠে যে কারো মন। এর কিছু দূর অগ্রসর হলে দেখা মিলবে পাতলাবনের।

আরো ঘুরে আসতে পারেন কলমাকান্দার লেঙ্গুরা সীমান্তের জিরো পয়েন্টে সাত শহীদের মাজার। এটি কোনো অলি, আওলীয়াদের মাজার নয়। ৭১’ এ মুক্তিযদ্ধকালীন সম্মুখ যুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সাত শহীদের কবরস্থান। সামনে দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে পাহাড়ের উপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের ক্যাম্প। পাশেই ঘুরাঘুরি করতে দেখা যাবে টহলরত বিএসএফদের। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছুতেই সামনে অগ্রসর হওয়া ঠিক হবে না। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আর এক পাহাড়ি নদী গনেশ্বরী।

এখানে দেখা যাবে উপজাতি নারীদের কয়লা আর নুড়ি পাথর উত্তেলনের দৃশ্য। সেখান থেকে ফিরতি পথে কিছু দূর এগোলেই হাতের বামে দেখা যাবে এক পাহাড়ি টিলা। কিছুতেই মিস করবেন না। নইলে সেখানে যাওয়াটাই অপূর্ণতা রয়ে যাবে। উপরে উঠার পর বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি গারো পাহাড় আর ইউটার্ন নদীর অপরূপ মনোরম ভিউ দেখতে পাবেন। আর বুক ভরে সতেজ বিশুদ্ধ নিশ্বাস নিতে পারবেন।

খাবারের জন্য দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সদরে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এছাড়া সাদা পাহাড় সীমানায়ও রয়েছে একাধিক খাবারের হোটেল ও পানীয়র ব্যবস্থা। ওই সব এলাকার বিভিন্ন স্থানে রান্নার মসলার পাশাপাশি হরেক রকম ভারতীয় প্রসাধনী দেদারছে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে সাবধানে দেখে-বুঝে কেনাকাটা করবেন। কেননা এর মধ্যে অনেক নকল সামগ্রী কিনে প্রতারিত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল যারা কখনো সেখানে যাননি তারা কিভাবে যাবেন। ট্রেন কিংবা সড়ক পথেও যাওয়া যাবে। বুধবার বাদে প্রতিদিন রাত ১০টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের উদ্দেশে আন্তঃনগর হাওর একপ্রেস ছেড়ে যায়।

ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলস্টেশন আর বাসের জন্য মহাখালি বাসটার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ হয়ে যাওয়া যায়। সাদা পাহাড়ে যেতে চাইলে ট্রেনের যাত্রীদের শ্যামগঞ্জ রেলস্টেশনে নেমে সোজা বিরিশিরির পথে যেতে হবে। আর প্রাইভেট গাড়ি হলে শ্যামগঞ্জ হয়ে সোজা বিবিশিরি, দুর্গাপুর হয়ে শিবগঞ্জ গোদারা পার হয়ে একেবারে সাদা পাহাড়স্থল।

আর কলমাকান্দা যেতে চাইলে নেত্রকোনার পরের স্টপেজ ঠাকুরাকোনা স্টেশনে নেমে অটো, সিএনজি বা মোটরসাইকেলে যাওয়া যাবে রংছাতির চন্দ্রডিঙ্গা, লেঙ্গুরা, পতলাবনে। যদি প্রথমে সাদা পাহাড়ে যান সেখানে ঘুরাঘুরি শেষ করে দুর্গাপুর থেকে কলমাকান্দা সড়ক পথে লেঙ্গুরা কিংবা চন্দ্রডিঙ্গাও যেতে পারবেন। প্রাইভেট কার হলে একদিনেই সব দেখা সম্ভব।

আর রাত্রিযাপন করতে চাইলে কলমাকান্দা বা দুর্গাপুর সদরে একাধিক থাকার হোটেল রয়েছে। এছাড়া বিরিশিরি কালচারাল অ্যাকাডেমিতে থাকার রেস্টহাউস রয়েছে। সেক্ষেত্রে অগ্রিম বুকিং দিতে হবে। আর যাদের প্রাইভেট গাড়ি নেই তারা ফেরার জন্য বিরিশিরি কালচারল অ্যাকাডেমির সামনে গেলেই দেখতে পাবেন ময়মনসিংহ ও ঢাকাগামী অনেক যাত্রীবাহী বাস অপেক্ষা করছে। কলমাকান্দা থেকেও ঢাকা যেতে সরাসরি বাস রয়েছে। তবে সন্ধ্যার আগেই ফেরার চেষ্টা করবেন।