পবিত্র ঈদ-উল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের বরণ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ও চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। ইতোমধ্যে উপজেলার আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, ঈদকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ রুম আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, শ্রীমঙ্গলে পাঁচ তারকা মানের হোটেলসহ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় শতাধিক আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে অর্ধশতাধিক দর্শনীয় স্থান, যা প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো: সেলিম আহমেদ জানান, জেলার শতাধিক পর্যটন স্পটের মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জই পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। এ দুই উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ ও হোটেল-মোটেল।
তিনি বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটিতে ইতোমধ্যে অনেকেরই প্রায় ৮০ শতাংশ রুম আগাম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। ঈদের লম্বা ছুটিতে শেষ পর্যন্ত শতভাগ রুম বুকিং হয়ে যাবে আমরা আশা করছি।'
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানায়, রমজানজুড়ে পর্যটকের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ফলে পরিবহন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে আসে। তবে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো সাজানো হয়েছে।
এদিকে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রায় সব হোটেল-রিসোর্টে রাখা হয়েছে বিশেষ অফার ও সুযোগ-সুবিধা। একইসাথে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক টহল দেবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। শহরের হোটেলগুলোতে আগাম বুকিং তুলনামূলক কম হলেও তাৎক্ষণিক পর্যটকের আগমনে সেগুলোও পূর্ণ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পর্যটকরা শহরের বাইরের রিসোর্ট ও কটেজে বেশি আগ্রহী। এছাড়া এসব স্থানে কক্ষ সংখ্যা কম থাকায় আগাম বুকিং দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলকে ঘিরে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন নৃ-জাতিগোষ্ঠী সংস্কৃতি এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। জেলার ৯২টি চা-বাগানের সবুজের সমারোহ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, মাধবকুন্ড ও হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
এ অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা জাদুঘর, চা কন্যার ভাস্কর্য, সাত রঙের চা, বধ্যভূমি-৭১, বাংলদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, রাবার বাগান, গোলটিলা, হজমটিলা, বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, পদ্মছড়া ও ক্যামেলিয়া লেক, মণিপুরী ললিতকলা অ্যাকাডেমি, হরিণছড়া গলফ মাঠসহ আরো অনেক স্থান।
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ‘ঈদে বিদেশী পর্যটক তুলনামূলক কম এলেও দেশীয় পর্যটকের চাপ থাকে বেশি। এবারও আমাদের সাত থেকে আট দিনের জন্য বুকিং প্রায় ৯০ ভাগ হয়েছে। যদি দেশের অবস্থা ভালো থাকে, তাহলে আশা করছি শতভাগ পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রচুর কল আসছে, পর্যটকের আগ্রহ এবার শ্রীমঙ্গল-সিলেটের দিকে।'
বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘আগামী ২১ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, এবার পর্যটক সমাগম আরো বেশি হবে।’
চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে, যাতে পর্যটকরা এখানকার সংস্কৃতির স্বাদ নিতে পারেন। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। টহল জোরদার থাকবে এবং সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’
শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহিবুল্লাহ আকন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইতোমধ্যে আমরা সব হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি। তাদেরকে বলেছি সব আইনশৃঙ্খলা সংস্থার ফোন-মোবাইল নাম্বার ও ফায়ার সার্ভিসের নাম্বার সংগ্রহে রাখার জন্য। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে যেন তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। তবে আশা করছি কোনো অঘটন ছাড়াই আমরা ঈদ উৎসব সম্পন্ন করতে পারব।’



