তালপাতার পাখার গ্রাম

প্রতিবছরের চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে তালপাখার চাহিদা বেড়ে যায়। তখন নিকলীর দামপাড়া গ্রামের নোয়ারহাটি, টেকপাড়া ও বর্মনপাড়ায় ঘরে ঘরে পাখা তৈরির ধুম পড়ে যায়।

মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ

Location :

Kishoreganj
দামপাড়া গ্রামে তালপাখা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা
দামপাড়া গ্রামে তালপাখা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা |নয়া দিগন্ত

চৈত্রের বাতাসে এখন উষ্ণতার ছোঁয়া। কচি আমের গুটি জানিয়ে দিচ্ছে বৈশাখের আগমনী বার্তা। এই সময় গরমে স্বস্তির পরশ পেতে হাতপাখার জুড়ি নেই। তালপাতার তৈরি এই হাতপাখার সাথে জড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামের প্রায় দুইশো পরিবারের জীবন-জীবিকা। এখানকার হাতপাখা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

প্রতিবছরের চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে তালপাখার চাহিদা বেড়ে যায়। তখন নিকলীর দামপাড়া গ্রামের নোয়ারহাটি, টেকপাড়া ও বর্মনপাড়ায় ঘরে ঘরে পাখা তৈরির ধুম পড়ে যায়।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারিগরেরা বাড়ির উঠানজুড়ে দল বেঁধে হাতপাখা তৈরির কাজ করেন। তবে এই তিন মাসের তালপাখার বাজারকে কেন্দ্র করে কারিগরেরা ব্যস্ত থাকেন বছরের অন্য সময়ও। এবারও লোডশেডিং এবং গরমের কারণে তালপাখার চাহিদা বেড়েছে। সারাদেশে যাচ্ছে দামপাড়া গ্রামের প্রাণ জুড়ানো এই হাতপাখা।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সরেজমিনে যেয়ে দেখা যায়, সেখানে এখন তালপাখা তৈরির ধুম লেগেছে। ছেলে, বুড়ো, কিশোর, কিশোরী, বসে নেই কেউ। ঘরের বউ-ঝিয়েরা তালের পাতাগুলো দা দিয়ে ফালি করে বেতি করছেন। এগুলো বুনন করে কেউ ছাঁটাই আকৃতি নিচ্ছেন। কেউ মোড়ল বাঁশ কেটে, ছেঁটে হাতল তৈরি করছেন। কেউ প্লাস্টিকের বেত ও সুতা দিয়ে জালি বেতের সাথে ছাঁটাই বা ছাঁচ সেলাই করে হাতপাকার আকৃতি দিচ্ছেন। কেউ বসেছেন রঙের তুলি নিয়ে। আর এই কাজগুলো করা হচ্ছে দল বেঁধে। ঘরের বারান্দায় কিংবা বাড়ির উঠোনে গাছের ছায়ায় বসে।

কথা হয় গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক নারী আশুলতা রায়ের (৮০) সাথে। তিনি জানান, ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে এ গ্রামে তালপাখা তৈরি হচ্ছে। ১২ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। শাশুড়ির হাত ধরে তিনি তালপাখা তৈরির কাজ শিখেন।

আশুলতা বলছিলেন, ‘গ্রামে প্রথম আমাদের এই ঘরে (নিজদের ঘর দেখিয়ে) আমার শাশুড়ি তালপাখা বানাতেন। শাশুড়ির কাছ থেকে আমি শিখেছি। আমার কাছ থেকে পরে গ্রামের অন্যরাও শিখেছে। এখন আমার বয়স হয়েছে, পারি না। আমার পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনি এখন তালপাখা বানায়।’

গ্রামের ভানুমতি সূত্রধর (৭৮) বলেন, ‘৫০-৬০ বছর ধরে আমরা হাতপাখা তৈরির কাজ করছি।’

তালপাখা যেভাবে বানানো হয় :
কাঁচা তালপাতা সংগ্রহ করে শুকিয়ে নির্দিষ্ট মাপে কেটে নিতে হয়। এরপর বেতির মতো করে এগুলো দিয়ে বুনন করে ছাঁচ তৈরি করা হয়। চক্রাকার ছাঁচের চারদিকে জালি বেত ঘুরিয়ে এর ওপর প্লাস্টিকের রিবন পেঁচানো হয়। পাখার হাতল বানানো হয় মোড়ল বাঁশ কেটে ফালি করে। এরপর সেলাই করা হয় নাইলন সুতা দিয়ে। হাতলে প্লাস্টিকের সরু পাইপ কেটে চুঙ্গি দেয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় হাতপাখা।

গ্রামের বিধবা বেদনা সূত্রধর বলেন, ‘এই হাতপাখার কাজ করেই আমাদের সংসার চলে। অনেকেই আগের থেকে এই কাজ করছেন, আমি ৫০ বছর ধরে করছি। মনে করলেই পাখার কাজ করেই চলছি। এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছি, দুই মেয়ে বাড়িতে আছে। তাদের নিয়ে ভালোই আছি।’

গ্রামে তালপাখা তৈরির কাজটা করেন মূলত নারীরাই। পুরুষেরা শুধু সরঞ্জাম এনে দেন। বাড়ির শিশু সন্তানেরা উঠানে বসে নারীদের হাতপাখা তৈরির কাজে সহযোগিতা করেন। পাকিস্তান আমল থেকে গ্রামে কারিগরেরা হাতপাখা তৈরি করে জীবিকা চালাচ্ছেন। তিন প্রজন্ম ধরে এ পেশায় সংসার চালাচ্ছেন গ্রামবাসী। বংশপরম্পরায় এ গ্রামে এখনো কিশোর-তরুণ বয়সীরা পাখা তৈরির পেশা বেছে নিচ্ছে।

গ্রামের বর্মনপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বড়দের পাশাপাশি অনেক শিশুও তালপাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত। এদের একজন অঙ্কিতা বর্মন (১১)। সে স্থানীয় বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অঙ্কিতা বলল, ‘পড়াশোনার ফাঁকে বাবা-মাকে আমরা তালপাখা বানানোর কাজে সহযোগিতা করি। এতে আয় হয়। খাতা-কলম কিনে দেন বাবা।’

গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধা আশুলতা রায়সহ বয়স্ক অনেকেই বলছিলেন— বাংলাদেশ হওয়ার অনেক আগে থেকেই দামপাড়া গ্রামে তালপাখা বানানো শুরু হয়। বাড়িতে শখের বসে আশুলতার শাশুড়ি (স্বর্গীয়) হেমলতা রায় প্রথমে তালের পাতা দিয়ে পাখা বানানো শুরু করেছিলেন। বাড়ির অতিথি সেবায় এই তালপাখা ব্যবহার করা হতো। তার কাছ থেকেই গ্রামের অন্যরা তালপাখা বানানো শিখেন। বর্তমানে গ্রামের ২০০ পরিবারের প্রায় এক হাজার মানুষ এই তালপাখা তৈরির কাজে জড়িত।

গ্রামের তালপাখার কারিগর লিপি রায় (৪০) জানান, তিনি তার শাশুড়ির কাছ থেকে পাখা বানানোর কাজ শিখেছেন। তাদের পরিবারের এটাই এখন একমাত্র পেশা।

তালপাখার কারিগর বিভা রায় বলেন, ‘পরিবারে ছেলেমেয়ে নিয়ে আমরা এখন পাঁচজন। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা, পরিবারের সবার খাদ্যসংস্থান, পোশাক-আশাক ও ওষুধপত্রের টাকা এই তালপাখা বিক্রির থেকেই জোগাড় করতে হয়।’

গ্রামের প্রবীণ কারিগররা জানায়, স্বাধীনতার আগে একটি পাখা তৈরিতে খরচ পড়ত চার আনা। বিক্রি হতো আট আনা থেকে এক টাকায়। এখন একটি পাখা তৈরিতে গড়ে খরচ পড়ে ৬০ টাকা। বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়।

গ্রামের কারিগর বিমলা সূত্রধর (৪৫) বলেন, ‘পাখা বিক্রি করতে বাজারে নেয়া লাগে না। পাইকাররা বাড়ি থেকে এসে কিনে নেন।’

গ্রামের দিবা রায় (৫৫) বলেন, ‘এক সময় পাখা তৈরি করে ভালোই লাভ হত। এখন পাখা তৈরির জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। একটি তালের পাতার দাম আগে ছিল ১০ টাকা, এখন ৪০ টাকা। আগে একটি বাঁশের দাম ছিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, এখন ২০০ টাকা দিয়েও কেনা যায় না। এছাড়া প্লাস্টিক, সুতা, চিকন পাইপ, মজুরি, সবকিছুর দাম বাড়তি। আগে পাখা তৈরি করে যেভাবে চলত, এখন আর সেভাবে চলে না।’

কারিগররা জানায়, এক সময় গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। তখন গরমে হাতপাখাই ছিল গ্রামের মানুষের ভরসা। এখন বিদ্যুৎ-জেনারেটর-আইপিএসসহ নানা যান্ত্রিকতার দাপট বেড়েছে। তবে কমেনি হাতপাখার কদর। এখনো গ্রাম-শহর দুই জায়গাতেই হাতপাখার বাজার রয়েছে। এই বাজার ধরে রাখতে এখন হাতপাখায় নানান রঙের নকশা ও জরি ব্যবহার করা হয়।

পাখার কারিগর মনসা বর্মন (৪২) বলেন, ‘একটি পাখা বানাতে প্লাস্টিক লাগে, জালি বেত লাগে, তালপাতা লাগে, এরপরে বাঁশ লাগে, চুঙ্গি লাগে। এসব দিয়ে তৈরি করতে হয়। সবশেষে রং দিতে হয়। রং না দিলে সুন্দর হয় না, তাই বেশি চলে না।’

জানা গেছে, এ গ্রামের কারিগরেরা এক সময় আশপাশের বিভিন্ন বাজার ও মেলায় হাতপাখা বিক্রির জন্য নিয়ে যেতেন। এখন আর সেটা করতে হয় না। পাখাগুলো রঙ-চঙে ও সুন্দর হওয়ায় বিভিন্ন জায়গার পাইকাররা বাড়ি থেকে এসে হাতপাখা কিনে নেন। তবে বিদ্যুতের পাখার ভিড়ে সারাদেশে ঐতিহ্যের হাতপাখা হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই দামপাড়া গ্রামের তালপাখা টিকে আছে। তবে বাঁশ, বেত, তালপাতার দাম বেড়ে যাওয়ায় হাতপাখা তৈরি করে এখন আর তেমন লাভ থাকছে না কারিগরদের। এ অবস্থায় তাদের সংসারে যেমন টান পড়েছে, ঐতিহ্যের এই পেশাটি টিকিয়ে রাখতে পারবে কিনা, এ নিয়ে তারা কিছুটা শঙ্কিতও।

তালপাখার কারিগর অলকা রায় বলেন, ‘আমাদের গ্রামে এই পেশায় ২০০ পরিবার জড়িত। আমাদের অন্য কোনো পেশা নেই। অন্য কোনো কাজও পারি না। বাপ-দাদার এই পেশাটাই আমরা ধরে রেখেছি। পাখা বানানোর জিনিসপত্রের দাম এখন অনেক বাড়তি। এগুলো জোগাড় করতে অনেকেই ঋণগ্রস্ত। সরকার যদি সুদ ছাড়া ঋণ দিত, তাহলে অনেক উপকার হতো।'