উত্তম গোলদার, মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে উপজেলা সদরসহ প্রত্যান্ত এলাকায় বাড়ছে বাড়ছে সূর্যমূখী ফুলের চাষ। তেলের বিকল্প হিসেবে ও অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকসহ স্থানীয়রা এ ফুলের চাষ করছেন। ফুলে ফুলে ভরে গেছে কৃষকের ফসলের মাঠ। ক্ষেত দেখে মনে হয় যেন সূর্যের দিকে মুখ করে তাকানো হলুদের সাজানো বাগান। বিস্তীর্ণ মাঠে সূর্যমুখী ফুলের সমারোহ। ফুলগুলো বাতাসে দোল খেয়ে যেন ভালোবেসে সকলকে কাছে টানছে তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। সূর্যমুখীর চাষ করে অধিক ফলনের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে খুশি উপজেলার চাষিরা।
উপজেলার রানীপুর এলাকায় মহাসড়কের পাশে এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই সূর্যমুখীর বাগানে আসছেন সৌন্দর্যপিপাসুরা। গত বছরের চেয়ে এবারে ১৫ একর জমিতে বেশী সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, উপজেলার ছৈলাবুনিয়া,ঝাটিবুনিয়া, রানীপুর, পশ্চিম রানীপুর, মির্জাগঞ্জ, হুজুরবাড়ি, হাসেম মার্কেট, তাজেম ব্রিজ, ভয়াং, ঝোপখালীসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ একর জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার দেউলী ও মজিদবাড়িয়া ইউনিয়নে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়েছে বেশি।
আরো জানা যায়, উপজেলায় রবি মৌসুমে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমি মৌসুমি পতিত থাকে। এসব মৌসুমি পতিত জমিসহ আবাদী জমিতে ৪০ হেক্টর জমিতে হাইসান, বারি সূর্যমুখী ও ইউনিসান জাতের সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। মাটি ও আবহাওয়ায় অনুকূলে থাকায় এ মৌসুমে সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন ও বাজারে দাম বেশি হওয়ায় এবারে খুশি সূর্যমুখী চাষিরা।
কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই ফুলের সার ও বীজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছে একটি করে ফুল আসে। বীজ বপনের পর ফসল সংগ্রহ করতে প্রায় তিনমাস সময় লাগে। এছাড়াও উপজেলায় এবারে মুগডাল পাঁচ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে, বোরোধান ১৫২ হেক্টর, মিষ্টিআলু ১২৮ হেক্টর, ভূট্টা ৩৫ হেক্টর,শীতকালীন সবজি ৫৬৭ হেক্টর,তরমুজ ২৫০ হেক্টর,সরিষা ৩২.৫ হেক্টর, চিনাবাদাম ১২০ হেক্টর, মরিচ ২৯৫ হেক্টর ও খেসারি দুই হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে রবিফসলের আবাদ হয়েছে।
উপজেলার রানীপুর গ্রামের কৃষক হাসান আকন বলেন, ‘এবারে ৫০ শতক জমিতে ইউনিসান-৩৬ জাতের সূর্যমুখি চাষ করেছি এবং আরো প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারনে মাঠে এখন বেশ সুর্যমুখীর ফুল ভালো দেখা যায়। পরিবারের তেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সূর্যমুখির বীজ বিক্রির আশা করছি। উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক তেল ফসলের আবাদ বৃদ্ধিতে কৃষকগণকে পরামর্শ ও সেবা দিয়েছেন। ফলে সূর্যমুখীসহ রবি মৌসুমে ফলন দ্বীগুন হয়েছে। প্রতি একর জমিতে সূর্যমুখীর ফলন হয় ২০ থেকে ২২ মণ। এর থেকে তেল পাওয়া যাবে প্রায় ১০-১২ মণ।’
ভয়াং গ্রামের কৃষক মো: ইসুফ খলিফা, তাজেম ব্রিজ এলাকার নাসির জোমাদ্দার বলেন, ‘উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবারে সূর্যমুখীর চাষ করে সফল হয়েছি। মাঠে ফলন অনেক ভালো। জমিতে এক একটি ফুল যেন হাসিমুখে সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তাহলে গত বছরের চেয়ে এবার বেশি লাভ হবে বলে আশা করছি।’
উপজেলা উপ-সহাকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: আমিনুল ইসলাম জানান, সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা সফলতার মুখ দেখছেন। যদি কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তবে তারা সূর্যমুখী চাষ করে দ্বিগুণ লাভ করতে পারবেন। তবে সরকারের তেল ফসলের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও আমদানি ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখছে। কৃষকসহ যারা এ ফুলের চাষ করেছেন তাদের জ্ঞাতার্থে সূর্যমুখীর বীজ ভাঙ্গানোর তৈল দুই মাসের বেশি রাখলে গন্ধ হতে পারে। তাই অল্প অল্প করে বীজ ভেঙে তৈল বের করে খেলে খাবারের স্বাদও ভালো পাওয়া যায়।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো: আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এ উপজেলার জমি সূর্যমুখী চাষের জন্য উপযোগী। এবছর সূর্যমুখী ফুলের চাষে কৃষক এবার ভালো ফলনের আশা করছেন। উপজেলায় ৪০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। হেক্টর প্রতি ১.৫ টন পর্যন্ত ফলন হয়। প্রতি কেজি বীজ থেকে প্রায় আধা লিটার তৈল উৎপাদন সম্ভব। সূর্যমুখী ফুলের বীজ থেকে হাঁস-মুরগির খাবার পাওয়া যায়, পাশাপাশি তেলের উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এবং সূর্যমুখী ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তেল, খৈল ও জ্বালানি পাওয় যায়। ফুলে থাকা লিনোলিক এসিড হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখে।
সূর্যমুখী ফুলের আবাদ যাতে আরো বৃদ্ধি পায়, সে জন্য কৃষকদের কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ ও উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।



