তামাকের বদলে তিস্তার চরে সূর্যমুখী ফুল

যেখানে যুগের পর যুগ বিষবৃক্ষ তামাকের একচ্ছত্র আধিপত্য, সেখানেই এবার ফুটেছে সম্ভাবনার সোনালি হাসি। আদিতমারী উপজেলা উত্তরে দুর্গাপুর ইউনিয়নে ধরলা আর দক্ষিণে মহিষখোচা ইউনিয়নে তিস্তা চরাঞ্চল এখন সূর্যমুখীর হলদে সৌন্দর্যে ভরপুর। সূর্যমুখী চাষে ভালো ফলনের লাভের আশায় কৃষকের মুখেও হাসির ছাপ।

আসাদুল ইসলাম সবুজ, লালমনিরহাট

Location :

Lalmonirhat
বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ
বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ |নয়া দিগন্ত

তিস্তা ও ধরলা নদী তীরের চরাঞ্চলে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী চাষ করে বাজিমাত করেছেন কৃষকরা।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার উত্তরে দুর্গাপুর ইউনিয়নে ধরলা আর দক্ষিণে মহিষখোচা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চর এখন হলুদে রাঙা। প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে চাষাবাদ হয়েছে সূর্যমুখীর। আর এতেই মিলেছে আশাব্যঞ্জক ফলন। কৃষকের মুখে তাই প্রশস্ত হাসির ছাপ। চরাঞ্চলের সেই বিষবৃক্ষ তামাকের জমিতে এবার সূর্যমূখী ফুলের মাঝে হাসছেন চাষিরা। তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বালুচরে এমন দৃশ্য আগে দেখা যায়নি।

যেখানে যুগের পর যুগ বিষবৃক্ষ তামাকের একচ্ছত্র আধিপত্য, সেখানেই এবার ফুটেছে সম্ভাবনার সোনালি হাসি। আদিতমারী উপজেলা উত্তরে দুর্গাপুর ইউনিয়নে ধরলা আর দক্ষিণে মহিষখোচা ইউনিয়নে তিস্তা চরাঞ্চল এখন সূর্যমুখীর হলদে সৌন্দর্যে ভরপুর। সূর্যমুখী চাষে ভালো ফলনের লাভের আশায় কৃষকের মুখেও হাসির ছাপ।

স্বল্পব্যয়ে অধিক মুনাফার ফসল হিসেবে সূর্যমুখী চাষে আগ্রহ বাড়ছে চরাঞ্চলের চাষিদের। তিস্তা নদীর বুকে জেগে উঠা বালু চরে দূর থেকে দেখলে মনে হয় হলুদের গালিচা বিছানো। কাছে গেলে দেখা মিলে বাতাসে দোল খাওয়া সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য। এ যেন মানুষকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তার নিজস্ব সৌন্দর্য উপভোগের জন্য। তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে এমন তেলজাতীয় ফসলের চাষ আগে হয়নি। প্রথমবারেই বাজিমাত করেছেন চাষিরা।

আদিতমারী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, বর্ষার শেষে চরাঞ্চলে জেগে উঠা জমিগুলো চাষাবাদের আওতায় আনতে চর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়। এ প্রকল্পের আওতায় চরাঞ্চলের পরিত্যাক্ত ও তামাকের জমিতে সূর্যমুখী চাষাবাদের জন্য চরাঞ্চলের কৃষকদের প্রদর্শনী দেয় কৃষি বিভাগ। প্রদর্শনী প্রাপ্ত চাষিরা শুধু মাত্র জমি দিয়েছে আর পরিচর্যা করেছেন। বীজ সার থেকে শুরু করে সকল খরচ বহন করেছে প্রকল্প। মানুষকে এসব তেলজাত ফসল চাষাবাদে আগ্রহ বাড়াতে এসব প্রদর্শনী দেয়া হয়।

ফলে আদিতমারী উপজেলার দুই প্রান্তের উত্তরে দুর্গাপুর ইউনিয়নে ধরলা আর দক্ষিণে মহিষখোচা ইউনিয়নে তিস্তা নদী প্রবাহিত। এ দুই ইউনিয়নের চরাঞ্চলের চাষিদের মাঝে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ভাবে পাঁচজন চাষিকে সূর্যমুখী চাষাবাদে প্রদর্শনী দেয় উপজেলা কৃষি বিভাগ।

কৃষি অধিদফতর আরো জানায়, আবহাওয়া অনুকলে থাকায় সূর্যমুখীর ফলন ভালো হওয়ায় চাষিদের মুখে ফুটেছে সুখের হাসি। তেল জাতীয় অন্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখীর চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা এ ফসল চাষে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। প্রথম বার এর চাষ ও ফলন দেখে আগ্রহ বাড়ছে চরাঞ্চলের চাষিদের। বাজার ভাল থাকলে এবং লাভজনক হলে তামাকের আগ্রাসন থেকে মুক্তি নিয়ে চাষিরা তেলজাত ফসলে আগ্রহী হতে পারে বলে জানান চাষিরা।

তিস্তা চরাঞ্চলের চাষি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রথম দিকে ভয় পেয়েছিলাম চাষাবাদে। কারন বিগত দিনে তামাক চাষ করেছি। নতুন ফসল কেমন হবে ফলন। তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। প্রদর্শনীর কারনে সকল খরচ কৃষি বিভাগ বহন করেছে। আমি শুধু পরিচর্যা করেছি। তেমন কোনো খরচ নেই। স্বল্প খরচে অধিক মুনাফা পেতে সুর্যমুখীর বিকল্প নেই। আমার এ খেত দেখে অনেক কৃষক আগামীতে তামাক ছেড়ে সূর্যমুখী চাষের স্বপ্ন দেখছেন।’

চাষি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘সূর্যমুখী চাষাবাদে বিঘা প্রতি খরচ পড়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। উৎপাদন হয় বিঘাপ্রতি ছয় থেকে সাত মণ। প্রতি মণ চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করা যায়। বীজ বপন করে দু’তিন বার সার ও সেচ দিলেই পরিচর্যা ও খরচ শেষ। পরে বীজ তুলে বাজারজাত করা। খরচ বাদে বিঘা প্রতি ২০ হাজার টাকার মত মুনাফা আসে।’

ওই এলাকার তামাক চাষি আজিজুল হক বলেন, ‘আমরা কৃষক লাভজনক ফসল চাই। স্বাস্থ্য ক্ষতি হলেও লাভের আশায় তামাক চাষ করি। সূর্যমুখীর খরচ কম। যদি বাজার ভাল থাকে সেক্ষেত্রে আগামীতে তামাক ছেড়ে এসব চাষাবাদ করার চিন্তা করছি।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার ওমর ফারুক বলেন, ‘অন্যান্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী গুণাগুণ ভালো এবং রোগবালাই কম হওয়ায় ফলন বেশি হয়। সূর্যমুখী থেকে পাওয়া তৈল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বাংলাদেশ সরকার কৃষককে সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে বীজ ও সার বিনামূল্যে বিতরণ করছি। তেল জাতীয় ফসল সূর্যমুখী চাষ কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়তা করবে।’