সাভারের সেই সিরিয়াল কিলারের হাসপাতালে মৃত্যু

সাভার মডেল থানা থেকে কয়েক শ’ গজ দূরত্বে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে কয়েক মাসের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি লাশটি উদ্ধার এবং সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সাভার মডেল মসজিদ এলাকা থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

আমান উল্লাহ পাটওয়ারী, সাভার (ঢাকা)

Location :

Savar
মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ
মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ |ফাইল ছবি

সাভারের আলোচিত ও কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ কারাগারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মারা গেছে।

সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্ট্রোকজনিত কারণে সকাল ৭টার দিকে মারা যায়।

সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলী নয়া দিগন্তকে আজ সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, সাভার মডেল থানা থেকে কয়েক শ’ গজ দূরত্বে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে কয়েক মাসের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি লাশটি উদ্ধার এবং সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সাভার মডেল মসজিদ এলাকা থেকে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে সিরিয়াল কিলারকে গ্রেফতার এবং তার মৃত্যুতে শেষ হলো এক ভয়ঙ্কর অপরাধ অধ্যায়ের, যা দীর্ঘদিন ধরে সাভারের জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি দুপুরে সাভার থানা রোডের পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবণের দ্বিতীয় তলা থেকে দুটি লাশ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে আসে তার নির্মম অপরাধের চিত্র। এর আগে একই ভবন থেকে আরো তিনটি লাশ এবং সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায় সম্রাট নিজ কাঁধে করে লাশটি নিচতলা থেকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছে। সেই নারীকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেয় সম্রাট। তদন্তে নেমে পুলিশ তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে গ্রেফতার করে এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। পরদিন ১৯ জানুয়ারি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে আদালত তা গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠায়।

সূত্র জানায়, সাইকো সম্রাট নামে পরিচিত এই ব্যক্তির আসল নাম সবুজ শেখ। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোছামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, ২০১৪ সালে সাভারের তেঁতুলঝরা ইউনিয়নে প্রথম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অপরাধজগতে তার প্রবেশ। ওই ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে চার্জশিটভুক্ত হলেও পরে জামিনে বের হয়। ২০১৯ সালে তিন মাসের মধ্যে দুইবার মাদক মামলায় গ্রেফতার হয় এবং পুনরায় জামিনে এসে এরপর ভবঘুরে জীবনযাপন করতে করতে সাভার পৌর এলাকায় অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে থাকে। তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি হত্যা ও দুটি মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ জুলাই বাসস্ট্যান্ডের সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধে হত্যা, ২৯ আগস্ট পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এক যুবককে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা, ১১ অক্টোবর একই স্থানে আরেক নারীকে হত্যা, ১৯ ডিসেম্বর আরো এক যুবককে হত্যা এবং চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে এক নারীসহ দুইজনকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা স্বীকার করে সে। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছিল তানিয়া আক্তারের ঘটনা। তানিয়া আক্তারের লাশটি প্রথম ছিল অজ্ঞাত। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় সম্রাট নিজ কাঁধে করে এক নারীর নিথর দেহ দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছে এবং আগুনে পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরে সাভার মডেল থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করা হয়।

পরদিন আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়ার পরও অজ্ঞাত ছিল সেই নারীর পরিচয়। ঘটনার এক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিড়িও ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীর উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় বসে মা জুলেখা বেগম তার নিখোঁজ মেয়ে তানিয়া আক্তারকে চিনতে পারেন। তিনি এর আগে ১ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার পর উত্তরখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। ভিডিও দেখে ১৯ জানুয়ারি রাতে পরিবার সাভার মডেল থানায় তানিয়ার লাশ শনাক্ত করে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হয় লাশটি তানিয়ার। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০ জানুয়ারি বিকেলে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তানিয়া ছিল তৃতীয়।