ময়মনসিংহে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নীরবে মাটির নিচে চাপা পড়ছে। রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার রেললাইন, যন্ত্রাংশ ও অবকাঠামো পড়ে আছে চরম অবহেলায়—কখনো আগাছা-আবর্জনার নিচে, কখনো মাটির স্তরে ঢেকে, আবার কোথাও খোলা আকাশের নিচে জং ধরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে শহরের পাটগুদাম এলাকা, রেলওয়ে ইয়ার্ড ও মিন্টু কলেজ সংলগ্ন রেলক্রসিং এলাকায় দেখা গেছে, বহু পুরনো রেললাইন বছরের পর বছর ব্যবহার না হওয়ায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। কোথাও অর্ধেক লাইন মাটির নিচে, কোথাও আগাছা ও ময়লার স্তূপে ঢেকে রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো স্থানে রেললাইন ভরাট করে কার্পেটিং দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সড়ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রেললাইন ও যন্ত্রাংশের অনেকগুলো এখনো পুনঃব্যবহারযোগ্য ছিল। কিন্তু সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো স্ক্র্যাপে পরিণত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেলকর্মী বলেন, এই লাইনগুলো সামান্য যত্ন নিলেই ব্যবহার করা যেত। এখন মাটির নিচে ঢুকে নষ্ট হচ্ছে।
বর্ষার পানি ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভারী স্টিলের অংশগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে বাড়তি ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। এই অব্যবস্থাপনার সুযোগে রেলওয়ের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, কাঁচাবাজার ও অস্থায়ী বসতি।
এক দখলদার বলেন, রেলের জায়গা ফাঁকা দেখে দোকান করেছি। কর্তৃপক্ষ বললে চলে যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসরিন আক্তার জানান, রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধ হওয়ার পর আবার দখল শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না; প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দ্রুতই ফের দখল হয়ে যায় এলাকা। খোলা জায়গায় পড়ে থাকা যন্ত্রাংশে জং ধরে দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। পুনঃব্যবহারের উদ্যোগ না থাকায় কোটি টাকার সম্পদ অপচয় হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে লোহার অংশ চুরির ঘটনাও ঘটে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একদিকে যন্ত্রাংশ সংকটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে যা রেলওয়ের পরিকল্পনাহীনতার স্পষ্ট চিত্র।
জেলা নাগরিক আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক শিব্বির আহমেদ লিটন বলেন, ‘নতুন লাইন করার বদলে পুরনো লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে সক্ষমতা কমে গেছে। অপচয় হওয়া সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।’
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ‘সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, জায়গা দখল হচ্ছে—কর্তৃপক্ষ নীরব।’
রেলের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন অনুমতি ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই, সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা করতে হবে।’
তবে বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় রেলওয়ের সম্পদ একদিকে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দখলদারদের কবলে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই অপচয় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেয়া হবে—এ প্রশ্ন এখন ময়মনসিংহবাসীর।


