“আমি তো চলে এসেছি, বাবা-মা, আপু ও ছোট বোন সুবাহকে ঈদের আগেই আসতে হবে। আমি অসুস্থ তাই মামার সাথে চলে এসেছি। আমি আর কখনো মাইক্রোতে উঠবো না। আর কখনো বিদেশে যাবো না।”
এভাবেই কথা বলছিল সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মিজানুর রহমান ও মেহের আফরোজ সুমীর মেঝ কন্যা ফাইজা আক্তার (১১)। একই দুর্ঘটনায় ফাইজার বড় বোন মোহনা (১৩), দেড় বছর বয়সী ছোট বোন সুবাহ এবং গাড়িচালক মোহাম্মদ জিলানী বাবর নিহত হন। বাবা-মা ও দুই বোনের মৃত্যুর খবর এখনো জানে না দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একমাত্র শিশু ফাইজা।
ফাইজা জানে, তার পরিবারের সবাই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন এবং ঈদের আগেই দেশে ফিরে আসবেন। মা-বাবা ও দুই বোনের সঙ্গে একসাথে ঈদ করবে এমন স্বপ্ন নিয়েই এখনো দিন কাটছে তার।
দুর্ঘটনার পর প্রায় এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাতে ফাইজাকে দেশে নিয়ে আসেন তার মামা সৌদি প্রবাসী আজহারুল ইসলাম সুমন। বর্তমানে ফাইজা রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের পাঁচরুখি গ্রামে তার দাদার বাড়িতে অবস্থান করছে। তাকে দেখতে শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। একমাত্র জীবিত শিশু ফাইজাকে ঘিরে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের পাঁচরুখি গ্রামের বাসিন্দা ও সৌদি আরবের হোটেল-কফিশপ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে পবিত্র ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যান। ওমরাহ শেষে ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জেদ্দা থেকে ফেরার পথে তাদের বহনকারী গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বাংলাদেশ সময় রাত ৩টার দিকে ঘটা এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৫জন নিহত হন।
নিহতরা হলেন মিজানুর রহমান (৪০), তার স্ত্রী মেহের আফরোজ সুমী (৩০), বড় কন্যা মোহনা (১৩), ছোট কন্যা সুবাহ (দেড় বছর) এবং গাড়িচালক মোহাম্মদ জিলানী। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় ফাইজা আক্তার।
সোমবার দুপুরে পাঁচরুখি গ্রামের অসিম উদ্দিন ব্যাপারী বাড়িতে গিয়ে কথা হয় নিহত মিজানুর রহমানের বড় ভাই বাহারুল আলমের সঙ্গে। তিনি জানান, “আমার ছোট ভাই মিজানের পরিবারের চার সদস্যের লাশ সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। লাশ দেশে আনতে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা প্রয়োজন। অনেকেই সমবেদনা জানিয়েছেন, কিন্তু কীভাবে লাশ আনা হবে সে বিষয়ে কেউ সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন না। এত টাকা আমরা কোথায় পাবো? প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে হয়তো সেখানেই দাফন করতে হবে।”
ফাইজার মামা মামুন হোসেন জানান, “আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি লাশগুলো দেশে আনার জন্য। কিন্তু বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এছাড়া আমার বোনজামাই মিজানের ব্যবসায়িক অংশীদারদের আচরণও সন্তোষজনক নয়। তারা একেক সময় একেক কথা বলছেন, দায়িত্ববোধের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, যেন দ্রুত মরদেহগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।”
উল্লেখ্য, একই দুর্ঘটনায় ভোলাকোট ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামের পাটোয়ারী বাড়ির আবুল হোসেন খোকার ছেলে গাড়িচালক হোসেন মোহাম্মদ জিলানী প্রকাশ বাবর (৩০) নিহত হন।



