কবিতা সত্য ও সুন্দরের কথা বলে। যাপিত জীবনকে উজ্জীবিত করে তুলতে কবিতার মতো আর কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। অবশ্য আল্লাহর কালাম, নবী রাসূলগনের বাণী এসব বিষয়ের হিসাব আলাদা।
কবিতা জীবন ও জগতকে ছন্দময় করে তোলে। কারণ, তার নিজস্ব একটি ছন্দ আছে। কবিতা প্রতিটি জীবনকে স্পন্দিত করে তোলে। কারণ, তার মাঝে ঢেউ খেলে— অনঘ এক মাধুর্য।
কবিতা কেবল মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তারই নয়— সে বখতিয়ারের দ্রুত ধাবমান ঘোড়ার মতো টগবগে। ক্ষিপ্রময় বীর ঈশা খাঁর মতো।
‘ভাবছি, চারতন্ত্রের সাথে পাঞ্জা লড়বো;
লড়বো একদল লুটেরা মাতালের সাথে।’ —(অনিবার্য নির্মাণ)
এ পংক্তি অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের চিরায়ত সংগ্রামের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিপ্লবীরা কবিতা পাঠ করতে করতে বিপ্লব করে। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কবিতা তাই যুদ্ধের ময়দানে শাণিত হাতিয়ারও বটে। তেমনই এক বিপ্লবী কাব্যগ্রন্হ ‘আগুনের ফুলকি নাচে।’ কাব্যগ্রন্থের কবি তাসনীম মাহমুদ। গ্রন্থটি সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ পাওয়া এক তরুণ দীপ্তিমান কবির অনঘ অভিব্যক্তি।
কবিরা স্বাপ্নিক। কবিরা আশাবাদী। জাতিকে হতাশায় নিমজ্জিত করা কবির কাজ না। ঝাড় লন্ঠন কবিতায় কবি তাই বলেন—
‘গুমোট রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে
ঝাড় লন্ঠনের মতো;
সম্ভাবনার সবকটি বাগানে একদিন
জ্বলে উঠবে লুসিফেরিনের জোনাক।
চোখ চিন্তা চাতকী চঞ্চু
জ্বলে ওঠা সে আলোয় খুঁজে নেবে সিরাতুল মুস্তাকিম।’
এখানে ‘চোখ চিন্তা চাতকী চঞ্চু’ পংক্তিতে ‘চ’ —এর অনুপ্রাস লক্ষ্মণীয়। যা কবির কাব্যালঙ্কার সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ।
তাসনীম মাহমুদ তৌহিদবাদী কবি। ইসলামী বোধ-বিশ্বাস তার কাব্যে তাই ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। তার একটি কবিতার নাম, ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা’। এ কবিতায় কবি বলেন—
‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব
সাব্বিত কালবী আলা দ্বীনিক,
পড়তে পড়তে মোনাজাতে চোখ কেঁদে ওঠে
শিশুর সরল স্বীকারোক্তির মতোন।’
‘যুগান্তরের চিঠি’ কবিতায় কবি একালের তরুণদের গাজী সালাউদ্দীন আইউবী বলে সম্ভোধন করেছেন। কবি বলেন—
‘সালাহউদ্দিন! উঠে দাঁড়াও; ঝাড়লন্ঠন জ্বেলে
লুসিফেরিনের বাহিনী নিয়ে সিনা টানটান
এগিয়ে যাও— হয়তো এবার অথবা
আর কখনো নয় ইতিহাস তোমার...।’
বিপ্লবীদেরও আছে সংসারী হওয়ার অনঘ আকাঙ্ক্ষা। আর তাই ‘ঠোঁটের গ্লাস’ কবিতায় কবি বলেন—
‘এহরাম বাঁধার মতো দৃঢ় প্রত্যয়ে
তোমাকে বেঁধেছি রমণী যুদ্ধের বিকেলে...
ধরে রেখে দু’হাত; উঠে এসো
স্নান উন্মুক্ত বুকের পাঁজরে।
গুলির কোলাহল হলে শেষ;
আমরা পরস্পর দেবো চুমুক ঠোঁটের গ্লাসে।’
এ কাব্যগ্রন্থে কবি মুজাহিদ সালাহউদ্দিন আইউবী (র.) কথা যেমন এনেছেন, তেমনিভাবে এনেছেন প্রখ্যাত সূফি সাধক বাহালুল মাজনুন (র.) -এর কথাও।
কাব্যগ্রন্থের প্রথম দিকের কিছু কবিতা যেমন, আচরকাচরি বৃষ্টি, জমিরউদ্দীনের হেমন্ত সকাল, নিলামের দুঃখ, জুমার গোধূলি প্রভৃতি। এসব কবিতা ভিন্ন রকম কাব্য দ্যোতনা নিয়ে ধরা দেবে পাঠকের মনে।
‘জলধারায় চেয়ে থাকা চাতকের অপেক্ষা নিয়ে
আমি দৌড়াচ্ছি শুন্য থেকে নিরন্তর শুন্যতার পথে’—
এখানে জলধারায় চাতকের চেয়ে থাকা উপমাটা বহু পুরাতন। বহুল ব্যবহৃত। আমরা কবির কবিতায় নতুন নতুন উপমা চাই।
এ কাব্যগ্রন্থে কবি যুদ্ধ বিগ্রহ, ইতিহাস ঐতিহ্য মূল্যবোধ কিছুই বাদ রাখেননি। কবির কাব্যনিষ্ঠা প্রশংসার দাবি রাখে।
কবি তার কাব্য চর্চা অব্যাহত রাখলে, নিজস্ব ধারা তথা নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি করতে পারলে আশা করি বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল স্হান অলঙ্কৃত করতে পারবেন।
বইটি পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে যাক। কবি হয়ে উঠুক লায়লাতুল কদরের মতোন দামী।



