গৃহকর্মী থেকে ছড়াশিল্পী সুকুমার বড়ুয়া

‘অভাব ছিল। অনাথ ছিলাম তো! বাড়ি বাড়ি কাজকর্ম করেই সময় কাটত। লেখা ছাপা হয়েছে তখনো এক বাসায় কাজ করতাম। যাদের রান্না করতাম, তাদের পাতে ভাত বেড়ে দিয়েই পত্রিকা আনতে ছুটলাম। তারপর এনে তাদের দেখাতাম। তারা বলতেন, ‘তুই না রান্না করিস? কখন লেখক হয়ে গেলি?’ তাজ্জব হয়ে যেত তারা।’– এভাবে গৃহকর্মী থাকা অবস্থায় প্রতিটি কাজের মুহূর্ত যেন হয়ে উঠেছিল তার জীবন ও সাহিত্যের বিশ্ববিদ্যালয়।

দ্বীন মোহাম্মাদ দুখু
সুকুমার বড়ুয়া–মৃত্যু : ২ জানুয়ারি ২০২৬; জন্ম : ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮
সুকুমার বড়ুয়া–মৃত্যু : ২ জানুয়ারি ২০২৬; জন্ম : ৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সুকুমার বড়ুয়া। একটি নাম। নাটকের চেয়েও নাটকীয় তার জীবন। দারিদ্র্যের কশাঘাত আর জীবনের পরতে পরতে জেগে ওঠা প্রতিকূলতার চর যেন তারই প্রতিচ্ছবি। একটি ফুটন্ত কলি যা প্রিয়জনের পরশে একটু একটু করে সেজে উঠত পরিপূর্ণ ফুলে, সেই কোমল কলি আচমকা গেল মূর্ছা। যেন একটি ‘ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ’ লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল পুরো বাগান। তাতে বাবা-হারা সুকুমার পড়ে রইলেন সেই বাগানের এক কোণে।

যেখানে বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়ার শোকে মুহ্যমান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্বজনহীন শুকনো পাতা, ব্যথাতুর ধুলো-বালি, মুমূর্ষু ডালপালার স্তূপ, মা কিরণবালা বড়ুয়া আর লাউডগার মতো নেতিয়ে পড়া সুকুমার। অনাহার, অনিশ্চয়তা আর চরম অভাবের মাঝে বেড়ে ওঠা সুকুমারকে সংবেদনশীল, বিনয়ী ও মানবিক তৈরি করে মা-ও চলে গেলেন ওপারে। অতঃপর বাগানের সেই ধুলো-বালি গায়ে, ডালপালা আর শুকনো পাতাগুচ্ছে ভেসে ভেসে কখনো মামাবাড়ি কখনো দিদির বাড়িতে সুকুমার নিয়েছিলেন একটুকু ঠাঁই। পড়াশোনা সেতো বিলাসিতা-দ্বিতীয় শ্রেণীর বিদ্যালয়েই আটকে যায় যার গণ্ডি।

সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উঁকি মারে কখনো ফল বিক্রেতা, আইসক্রিমওয়ালা, ফেরিওয়ালা কখনো বা পুরোদস্তুর এক গৃহকর্মী। তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গৎবাঁধা কোনো নিয়ম না থাকায় সুকুমার এক এক করে হয়ে ওঠেন সবার ছাত্র। রপ্ত করেন ঋণ-দারিদ্র্যে ডুবে থাকা অর্থনীতি, কষ্ট-ক্লেদের বৃষ্টিতে নিমজ্জিত জীবনস্পর্শী সাহিত্যবোধ। এরই ফসল হিসেবে ১৯৫৮ সালে তিনি লিখে ফেলেছিলেন, ‘বৃষ্টি নেমে আয়’ নামে প্রথম ছড়া। তারপর প্রিয় বৃষ্টির সান্নিধ্য পাওয়ার আক্ষেপে হয়তো বলে ওঠেন, ‘ময়না পাখির খালাত ফুফুর/সয়না গায়ে গরম দুপুর/মন খুশি হয় তখন-/বৃষ্টি টাপুর টুপুর’ ইত্যাদি আরো কত কি!

সুকুমার বড়ুয়া ঠিক এই সময়ের স্মৃতি নিয়ে একবার বলেছিলেন, অভাব ছিল। অনাথ ছিলাম তো! বাড়ি বাড়ি কাজকর্ম করেই সময় কাটত। লেখা ছাপা হয়েছে তখনো এক বাসায় কাজ করতাম। যাদের রান্না করতাম, তাদের পাতে ভাত বেড়ে দিয়েই পত্রিকা আনতে ছুটলাম। তারপর এনে তাদের দেখাতাম। তারা বলতেন, ‘তুই না রান্না করিস? কখন লেখক হয়ে গেলি?’ তাজ্জব হয়ে যেত তারা।

এভাবে গৃহকর্মী থাকা অবস্থায় প্রতিটি কাজের মুহূর্ত যেন হয়ে উঠেছিল তার জীবন ও সাহিত্যের বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে বাবু মনোমোহন তালুকদারের বাড়িতে তিন টাকা বেতনে, ১৯৫২ সালে ভৈরব বাজারে পাঁচ টাকা বেতনের রান্নার কাজ থেকে ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৪ টাকা বেতনে চাকরি পান। এই পুষ্টিভবনে ‘সহকারী স্টোর কিপার’ হিসেবে কর্মরত থাকাকালীনই তার সাহিত্যচর্চা আরো গভীর ও বিস্তৃতি লাভ করে। পরে অবশ্য পদোন্নতি পেয়ে তিনি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হন এবং ১৯৯৯ সালে স্টোর কিপার হন।

১৯৬৩ সালে তোপখানা রোডে ছয় টাকায় বেড়ার ঘর ভাড়া করে স্বাধীনভাবে লেখালেখি শুরু করেন। লিখতে থাকেন আপন মনে। যেখানে ছিল লোকজ ছন্দ, গ্রামীণ খেলাধুলা, ধাঁধা, হেঁয়ালি, মনসার পুঁথি ও ভেলুয়ার পুঁথির স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।

সহধর্মিণী ননি বালা বড়ুয়া ও চার সন্তান– চন্দনা, রঞ্জনা ও অঞ্জনা এবং অরূপ রতন বড়ুয়াকে নিয়ে অভাবের তাড়নায়, দু’মুঠো ভাতের আশায় ছুটতে ছুটতে সুকুমার বড়ুয়া পেয়ে গিয়েছিলেন ছন্দের এক আশ্চর্য জাদুর কাঠি। ছন্দের সেই জাদুর কাঠি দিয়েই তো একের পর এক লিখেছিলেন কালজয়ী সব চরণগুচ্ছ– ‘অসময়ে মেহমান/ঘরে ঢুকে বসে যান/বোঝালাম ঝামেলার/যতগুলো দিক আছে/তিনি হেসে বললেন/ঠিক আছে ঠিক আছে।’ তার ছড়া ও ছন্দের ভেতর এত আলো, এত বিস্ময়, এত গল্প– এগুলোই হয়তো তাকে ছড়ারাজ, ছড়াসম্রাটে পরিণত করেছে।

ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৭ সালে একুশে পদক পান সুকুমার বড়ুয়া। এ ছাড়াও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কারসহ নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ সুকুমার বড়ুয়া রাজধানীতে স্ত্রী ও ছেলের সাথে থাকছিলেন। ২০২২ সালে তিনি গ্রামের বাড়ি ‘শুভালয়’-এ ফিরে যান। এরপর এ বছরের ২ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে মারা যান।

১৯৩৮ সালে জন্ম নেয়া এক ছন্দরাজের অনবদ্য ছড়াগ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘ছোটদের হাট’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘যুক্তবর্ণ‘, ‘চন্দনার পাঠশালা’, ‘জীবনের ভেতরে বাইরে’ ইত্যাদি রয়ে যাবে।

কিন্তু সাহিত্যপ্রেমীরা হারিয়েছেন এক ছন্দের জাদুকরকে। যে জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কাটিয়ে দেয়া যায় রাতের পর রাত, তামাম জনম।