চারুকলায় একুশে পদক পাচ্ছেন নাটোরের ড. আব্দুস সাত্তার

শিল্পি আব্দুস সাত্তারের শিল্প কর্মের সাথে পরিচয় যে কোনো কবির জন্যেই পরিতৃপ্তির ব্যাপার। তার কাজে বিশেষ করে গ্রাফিক প্রিন্ট ও জল রঙের কাজ দর্শকের চোখ আনন্দে স্নিগ্ধ হয়ে উঠে। প্রিন্টের মধ্যে বহুবর্ণ রেখার সমাবেশ ঘটিয়ে তিনি যে ছন্দের সৃষ্টি করে সাহস করে বলতে পারে তা কবিতারই সগোত্র।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
চারুকলার শিক্ষক ড. আব্দুস সাত্তার
চারুকলার শিক্ষক ড. আব্দুস সাত্তার |সংগৃহীত

বিশ্ব বরেণ্য চারুকলার শিক্ষক, লেখক এবং গবেষক প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তার এবারের একুশে পদক পেতে যাচ্ছেন। আগামীকাল রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা হস্তান্তর করা হবে।

১৯৪৭ সালে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চকবড়াইগ্রামে জন্মগ্রহনকারী আব্দুস সাত্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পরে ১৯৭৩ সালে ওরিয়েন্টাল আর্ট বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিত্রকলা, ছাপচিত্র এবং ভাস্কর্যের ওপর দুই বছর পড়াশোনা করেন। আব্দুস সাত্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্য এবং ব্রুকলিনের প্রাট ইনস্টিটিউটে ছাপচিত্রের ওপরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

তিনি বাংলাদেশের নতোন্নত কাঠখোদাই শিল্পের ওপরে গবেষণা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে অবসর গ্রহণের পর অদ্যাবধি অনারারি প্রফেসর হিসেবে সপ্তাহে দু’দিন ক্লাস নিয়ে যাচ্ছেন।

আব্দুস সাত্তার শিল্পকলার পাশাপাশি নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। এ সংক্রান্ত অসংখ্য প্রবন্ধ জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পকলার ওপরে তার লেখা ২৬টি বই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই।

প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় ‘বাংলাদেশের নতোন্নত দারুশিল্প’, ‘শিক্ষা সংস্কৃতি রাজনীতি’, ‘অলংকার’, ‘বাংলার শাসক জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ও গ্রাফিতির বিপ্লব, ‘১২৫ বিশ্বসেরা প্রিন্টমেকার’ উল্লেখযোগ্য।

সময়ের বিমূর্ত বিবর্তনের সুরেলা ধারায় শিল্পি আব্দুস সাত্তারের শিল্পসত্তা এবং রঙের ইজেলে বারবার পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন পদ্ধতি ও প্রকরণের ভেতর দিয়ে তিনি তার শিল্প সৃষ্টির ধারা প্রবাহমান রেখেছেন। প্রথমদিকে প্রাচীন মোঘল এবং পারসিক চিত্রকলার সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ভূবন অঙ্কন করেছেন। পরে মনোনিবেশ করেছেন ছাপচিত্রে। এক সময় কাঠখোদাই শিল্প হয়ে ওঠে অবলম্বন। কাঠ, জলরং, এক্রেলিক এবং তেলরং তার শিল্পের মাধ্যম। শিল্পির কাজে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দু’টি ধারাই বিদ্যমান। সত্তরের দশক থেকে শিল্পকর্মে তিনি এখনো নিরবধি। এই পর্যন্ত শিল্পির ছয়টি একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। দেশের বাইরে অন্তত ২৪টি দেশে আব্দুস সাত্তারের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া ঢাকার সোনারগাঁও অভ্যন্তরীণ সজ্জার কাজ তিনি করেছেন। হোটেলের কক্ষসহ সর্বত্র তার অঙ্কিত ৩৫০টি চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। শিল্পির বিভিন্ন পুরষ্কার প্রাপ্তির সংখ্যা অর্ধ শতাধিক।

কবি আল মাহমুদ শিল্পি সাত্তারের শিল্পকর্ম সম্পর্কে বলেছেন, ‘শিল্পি আব্দুস সাত্তারের শিল্প কর্মের সাথে পরিচয় যে কোনো কবির জন্যেই পরিতৃপ্তির ব্যাপার। তার কাজে বিশেষ করে গ্রাফিক প্রিন্ট ও জল রঙের কাজ দর্শকের চোখ আনন্দে স্নিগ্ধ হয়ে উঠে। প্রিন্টের মধ্যে বহুবর্ণ রেখার সমাবেশ ঘটিয়ে তিনি যে ছন্দের সৃষ্টি করে সাহস করে বলতে পারে তা কবিতারই সগোত্র।’

শিল্পি আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘১৯৮৮ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীতে বিশ্বের চারুকলা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন বিশ্বের খ্যাতিমান ১২৫ জন শিল্পির তালিকা প্রণয়ন করে। ওই তালিকাতে আমাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এটি গৌরব ও প্রশান্তির। শিল্পের কাজ, শিক্ষকতা এবং লেখালেখির মাধ্যমে সুন্দর জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকে উপভোগ করে যেতে চাই।’

সূত্র বাসস