প্রকাশিত হলো খামেনির রণবিদ্যার বই ‘যুদ্ধের জ্যামিতি’

‘দুশমনকে বোঝার এবং মোকাবেলার কৌশল নিয়ে নতুন আলোচনা’

বইটির সংক্ষেপে নাম ‘যুদ্ধের জ্যামিতি।’ পুরো নাম, যুদ্ধের জ্যামিতি শত্রুকে বোঝা এবং আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলি খামেনির চিন্তাধারা অনুসারে শত্রুকে মোকাবেলার পদ্ধতি। মুদ্রিত সংস্করণ বাজারে আসার আগেই বইটির ইলেকট্রনিক সংস্করণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
খামেনির রণবিদ্যার বই ‘যুদ্ধের জ্যামিতি’
খামেনির রণবিদ্যার বই ‘যুদ্ধের জ্যামিতি’ |ছবি: তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি

ইরানের ধর্মীয় নগরী কোম থেকে শহীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনির রণবিদ্যার একটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। পবিত্র রমজানের শেষ শুক্রবারকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লা খোমেনি রহ:-এর আহাবানে কুদস দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

এ দিবস পালনের আগেভাগে এবারে বইটি প্রকাশিত হয় বলে জানায় ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি।

বইটির সংক্ষেপে নাম ‘যুদ্ধের জ্যামিতি।’ পুরো নাম, যুদ্ধের জ্যামিতি শত্রুকে বোঝা এবং আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলি খামেনির চিন্তাধারা অনুসারে শত্রুকে মোকাবেলার পদ্ধতি। মুদ্রিত সংস্করণ বাজারে আসার আগেই বইটির ইলেকট্রনিক সংস্করণ পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য দ্রুত পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দেয়া এবং চলমান সঙ্ঘাত এবং রাজনৈতিক লড়াই সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো।

ইসলামী ইরান এবং প্রতিরোধ ফ্রন্ট নিজেদের ভাষায় বলছে, তারা আমেরিকান জায়োনিস্ট ফ্রন্টের চাপ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটেই পাঠকদের হাতে তুলে দেয়া হলো বইটির ডিজিটাল সংস্করণ।

ইসলামিক রেভল্যুশন পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত এই বই আসলে শহীদ খামেনিরি নানা সময়ের বক্তব্য এবং নির্দেশনার সংকলন। বিপ্লবী নেতৃত্বের শহীদ নেতা হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহ খামেনির বক্তব্যগুলো এখানে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে। বইতে আলোচনায় এসেছে বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী শক্তির শত্রুতা কিভাবে কাজ করে। কিভাবে প্রচারযুদ্ধ চলে। কিভাবে সংস্কৃতি ও মিডিয়াকে ব্যবহার করে মতাদর্শিক লড়াই চালানো হয়। তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির ভাষায় বইটি ইসলামি বিপ্লবের দৃষ্টিতে বিশ্ব রাজনীতির সঙ্ঘাতকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

৩৬২ পৃষ্ঠার এই বইয়ে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। শত্রুর লক্ষ্য কিভাবে বুঝতে হবে। নরম যুদ্ধ বা সফট ওয়ারের কৌশল কী। মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি করার পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে। বইটিতে বলা হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধ শুধু বন্দুক বা ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ নয়। আছে প্রচারযুদ্ধ। সাংস্কৃতিক লড়াই। মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তথ্যের লড়াই। এসব ক্ষেত্রেও শত্রু সক্রিয়। লেখকের ভাষায়, এসবকেই বলা হয়েছে সফট ওয়ার বা নরম যুদ্ধের সরঞ্জাম।

গণমাধ্যম এবং সংস্কৃতি কিভাবে বর্ণনার যুদ্ধ বা ন্যারেটিভের লড়াইয়ে ভূমিকা নেয়। পাশাপাশি প্রতিরোধের রাজনীতিতে ঐক্য এবং সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, এমন সময় বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যাতে ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং প্রতিরোধ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই আলোচনাগুলো নতুন করে সামনে আসে।

যুদ্ধ নিয়ে বইয়ের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। যুদ্ধ কেবল বন্দুক আর গোলার লড়াই নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে কৌশল বুদ্ধি মনস্তত্ত্ব এবং রাজনীতি। সেই কারণেই ইতিহাস জুড়ে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে বহু বই লেখা হয়েছে। সবচেয়ে প্রাচীন এবং বিখ্যাত বইগুলোর একটি হলো চীনা সেনানায়ক সান জুর আর্ট অব ওয়ার। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে লেখা এই বই আজও সামরিক একাডেমি থেকে ব্যবসা শিক্ষা পর্যন্ত নানা জায়গায় পড়ানো হয়। সান জু লিখেছিলেন যুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কৌশল হলো শত্রুকে যুদ্ধ ছাড়াই পরাজিত করা। শত্রুকে বুঝে নেয়া আর নিজের শক্তি দুর্বলতা জানা যুদ্ধের মূল চাবিকাঠি।

পশ্চিমা সামরিক চিন্তার ইতিহাসেও এমন অনেক বই আছে। উনিশ শতকে প্রুশিয়ার সেনা কর্মকর্তা কার্ল ফন ক্লজেভিৎস লিখেছিলেন অন ওয়ার নামে এক বিখ্যাত গ্রন্থ। ক্লজেভিৎস বলেছিলেন যুদ্ধ আসলে রাজনীতিরই অন্য রূপ। এই ধারণা আধুনিক সামরিক কৌশলের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে ফরাসি সামরিক তাত্ত্বিক আঁতোয়ান অঁরি জোমিনি যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। তার বই আর্ট অব ওয়ার ইউরোপের সামরিক শিক্ষায় দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলেছে।

বিশ শতকে যুদ্ধের ধরন বদলে গেলে বইয়ের ভাষাও বদলায়। উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম এবং গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে নতুন চিন্তা সামনে আসে। চীনের নেতা মাও সে তুং লিখেছিলেন, অন গেরিলা ওয়ারফেয়ার। সেখানে তিনি বলেন ছোট শক্তি কীভাবে বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে পারে। কিউবার বিপ্লবী চে গুয়েভারা গেরিলা ওয়ারফেয়ার বইয়ে একই ধরনের কৌশলের কথা বলেন। ভিয়েতনামের জেনারেল ভো নগুয়েন জিয়াপ তার লেখায় দেখিয়েছেন কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী জনগণের যুদ্ধ বড় সামরিক শক্তিকেও পরাজিত করতে পারে। এসব বই শুধু সামরিক পাঠ্য নয়। রাজনৈতিক আন্দোলন এবং বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আধুনিক যুগে যুদ্ধের নতুন ধারণা নিয়ে আলোচিত হয়েছে আরো অনেক কেতাবে। আমেরিকান বিশ্লেষক উইলিয়াম এস লিন্ডের ধারণা ‘ফোর্থ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার’ তেমনই একটি বই। এই পুস্তকে রাষ্ট্রের পাশাপাশি অরাষ্ট্রীয় শক্তি। মিডিয়া। মতাদর্শ। তথ্যযুদ্ধ সবকিছুই হয়ে ওঠে সংঘর্ষের অংশ।

এ দীর্ঘ ঐতিহ্যের ভেতরেই নতুন বই ‘যুদ্ধের জ্যামিতি’কে দেখা হচ্ছে। যেখানে সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে তথ্যযুদ্ধ। সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। এবং রাজনৈতিক বয়ানের লড়াই।

একই ধারার আধুনিক আলোচনায় যুক্ত হয়েছে নতুন ধরনের যুদ্ধের ধারণা। তথ্যযুদ্ধ সাইবার যুদ্ধ এবং ন্যারেটিভের যুদ্ধ এখন রণ-কৌশলের অংশ। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয় বরং মিডিয়া তথ্যপ্রবাহ এবং জনমতের ভেতরেও লড়াই হবে। ব্রিটিশ সামরিক চিন্তাবিদ লরেন্স ফ্রিডম্যান তার স্ট্র্যাটেজি এ হিস্ট্রি বইয়ে দেখিয়েছেন যুদ্ধের কৌশল কিভাবে যুগে যুগে বদলেছে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে বদলে যাচ্ছে।

এই সব বই একটা জিনিস শেখায়। শত্রুকে চেনো। নিজেকে শক্ত করো। লড়াইটা শুধু মাঠে নয়। মনে মিডিয়ায় সংস্কৃতিতেও। খামেনির এই বই ঠিক সেই লাইনে। সফট ওয়ার আর ন্যারেটিভের যুদ্ধকে জ্যামিতির মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে। পুরনো ক্লাসিকগুলোর সাথে মিলিয়ে নতুন যুগের রণকৌশল।

এই বৃহৎ ঐতিহ্যের মধ্যেই নতুন বই যুদ্ধের জ্যামিতিকে দেখা হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বইটি মূলত ইসলামি বিপ্লবের দৃষ্টিকোণ থেকে সঙ্ঘাত এবং প্রতিরোধের কৌশল বোঝানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শত্রুকে বোঝা এবং তার কৌশল বিশ্লেষণ করা প্রতিরোধ রাজনীতির প্রধান শর্ত।

তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, খুব শিগগিরই এর মুদ্রিত সংস্করণও প্রকাশিত হবে। যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে হাজার বছরের বিতর্কের ধারায় নতুন করে আরেকটি বই যুক্ত হলো। আর সেই বই প্রকাশের সময়টাও এমন এক মুহূর্তে যখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার চলমান যুদ্ধের ছায়া ঘন হয়ে উঠছে।