জুনের প্রথমার্ধে গরমের দাপট, মাঝামাঝি বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত

মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর প্রথমে দক্ষিণাঞ্চলে, পরে মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। ঢাকায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ভ্যাপসা গরম পুরোপুরি কমবে না।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আবহাওয়া অধিদফতর
আবহাওয়া অধিদফতর |সংগৃহীত

চলতি জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম বৃষ্টিপাত এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেয়া বিশেষজ্ঞ কমিটি।

গত সোমবার ঢাকার ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত কমিটির নিয়মিত সভার বরাত দিয়ে আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মো: মমিনুল ইসলাম জানান, জুনের প্রথমার্ধেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু বা বর্ষাকাল সারাদেশে বিস্তার লাভ করতে পারে। তবে বর্ষা শুরু হলেও মাসজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম থাকতে পারে।

তিনি জানান, জুন মাসে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। মৃদু তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মাঝারি তাপপ্রবাহে ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।

এছাড়া মাসজুড়ে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি মৌসুমী নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জুন মাসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই সময়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ৬০০ থেকে ৬৩০ মিলিমিটার, বরিশাল বিভাগে ৪২০ থেকে ৪৭০ মিলিমিটার, রংপুর বিভাগে ৪০০ থেকে ৪২০ মিলিমিটার, ঢাকা বিভাগে ৩৩০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার, খুলনা বিভাগে ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার এবং রাজশাহী বিভাগে ২৭০ থেকে ২৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ মো: শাহীনুল ইসলাম জানান, দেশের কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত শুরু হলেও তা এখনই তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো নয়। বগুড়া, রাজশাহী, নেত্রকোনা ও রংপুরের কিছু স্থানে বৃষ্টি হয়েছে, ফলে স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। তবে তাপপ্রবাহ পুরোপুরি প্রশমিত হতে আরো দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।

তিনি বলেন, ঢাকায় এখনো উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি এবং গরমের অনুভূতি অব্যাহত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু এখনো বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি; এটি বর্তমানে মিয়ানমার উপকূলের কাছে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে পৌঁছাতে আরো তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।

শাহীনুল ইসলাম জানান, মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর প্রথমে দক্ষিণাঞ্চলে, পরে মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। ঢাকায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও ভ্যাপসা গরম পুরোপুরি কমবে না।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সারাদেশে গড়ে ২৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ময়মনসিংহ, সিলেট, ঢাকা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেও চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।

মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় দিনাজপুরে। ১৩ মে সেখানে একদিনে ১৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। মাসজুড়ে পশ্চিমা লঘুচাপ ও পূর্বালী বায়ুর সংযোগের কারণে দেশের অধিকাংশ এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময় বজ্রপাত, দমকা হাওয়া ও বিচ্ছিন্নভাবে শিলাবৃষ্টিও দেখা গেছে।

অন্যদিকে, মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক দফা মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৮ মে চুয়াডাঙ্গায় রেকর্ড করা হয়। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ৩ মে সিলেটে রেকর্ড করা হয়। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল।

নদ-নদীর পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান নদীগুলোর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকতে পারে। তবে উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্ন ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কিছু নদ-নদীর পানি সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

এদিকে আবহাওয়া নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান জানান, এখনো মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা পুরোপুরি বাংলাদেশে প্রবেশ না করায় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ১০ জুনের আশপাশে মৌসুমি বায়ু দেশে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করতে পারে এবং ১১-১২ জুন থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর আগে পর্যন্ত মূলত প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রবণতাই বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ১০ জুনের পর দেশের অভ্যন্তরে মৌসুমি বায়ু আরো সক্রিয় হয়ে সারাদেশে বৃষ্টিপাতের বিস্তার ঘটাতে পারে। টানা তিন থেকে চার দিন বৃষ্টিপাত চলার পর মাঝেমধ্যে বিরতিও দেখা যেতে পারে। এমন বিরতিসহ জুন মাসের শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বছর জুন মাসে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ভারী বৃষ্টিপাত হলেও তা মাসের শেষার্ধে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দেশের সামগ্রিক মাসিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কম থাকতে পারে।

এই আবহাওয়াবিদ জানান, বর্তমানে চলমান তাপপ্রবাহের প্রভাব কম-বেশি ১০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ৫ জুনের পর বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত বাড়তে শুরু করলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। বৃষ্টিপাতের কারণে সাময়িক স্বস্তি মিললেও পরে আবার ভ্যাপসা গরম অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, জুনের প্রথমার্ধে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও মাসের শেষার্ধে উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেলে নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতে স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতা বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে বড় ধরনের বন্যার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। বাসস