বিদায়ের দুয়ারে কিংবদন্তিরা, আজ থামছেন কে?

এ ম্যাচে হারলেই শেষ হয়ে যাবে বিশ্বকাপ স্বপ্ন; আর হয়তো শেষ হয়ে যাবে দুই কিংবদন্তির অন্তত একজনের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারও। মদরিচের ক্ষেত্রে সেটি প্রায় নিশ্চিত, আর ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা বলছে—এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপের শেষ নকআউট।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ |সংগৃহীত

বিশ্বকাপের শেষ ৩২। টরন্টোর আলো ঝলমলে রাতে মুখোমুখি পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। এটি সাধারণ কোনো নকআউট ম্যাচ নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। কারণ এই ম্যাচটি হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো মুখোমুখি দাঁড় করাবে দুই সমসাময়িক মহাতারকা—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচকে।

এ ম্যাচে হারলেই শেষ হয়ে যাবে বিশ্বকাপ স্বপ্ন; আর হয়তো শেষ হয়ে যাবে দুই কিংবদন্তির অন্তত একজনের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারও। মদরিচের ক্ষেত্রে সেটি প্রায় নিশ্চিত, আর ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা বলছে—এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপের শেষ নকআউট।

অর্থাৎ পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া—এটা কেবল একটি নকআউট ম্যাচ নয়। এটা দুই কিংবদন্তির জীবনের দুই সমান্তরাল নদীর শেষ প্রান্তে এসে মিলিত হওয়ার গল্প। সব গল্পেরই একদিন শেষ অধ্যায় আসে। হয়তো আজ সেই অধ্যায়েরই আরেকটি পৃষ্ঠা উল্টানোর দিন।

একজনের শৈশব কেটেছে যুদ্ধের বিভীষিকায়। গোলার শব্দ, উদ্বাস্তু শিবির, হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই ফুটবলের স্বপ্ন আঁকড়ে বড় হয়েছেন লুকা মদরিচ।

আরেকজন বেড়ে উঠেছেন আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপ মাদেইরায়। অভাব, অনটন আর অবহেলাকে সাথী করে নিজের দুই পায়ে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

তাদের পথ আলাদা ছিল, কিন্তু গন্তব্য এক। নিজেদের দেশকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে আগে কখনো পৌঁছাতে পারেনি। মদরিচ ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে শুধু নেতৃত্ব দেননি, একটি ছোট্ট দেশকে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তির কাতারে দাঁড় করিয়েছেন।

২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান—মাত্র কয়েক মিলিয়ন মানুষের দেশের জন্য যা ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

আর রোনালদো? তিনি পর্তুগালকে বদলে দিয়েছেন ভেতর থেকে। ইউসেবিওর পর যে দেশটি যখন বিশ্বমঞ্চ থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি হাল ধরে ফিরিয়ে এনেছেন সাফল্যের আলোয়। বিশ্বকাপ, ইউরো, নেশনস লিগ—প্রতিটি মঞ্চেই পর্তুগালের নাম উচ্চারণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তিনি।

একজন ছিলেন মাঝমাঠের কবি। বল যেন তার পায়ের কাছে এসে ভাষা খুঁজে পেত। ট্রিভেলা, আউটসাইড পাস, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই ছিল শিল্পের ছোঁয়া। অন্যজন ছিলেন গোলের স্থপতি। প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি লাফ, প্রতিটি হেড, প্রতিটি শট—সবই যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার একেকটি অধ্যায়।

রিয়াল মাদ্রিদে ছয় বছর পাশাপাশি খেলেছেন তারা। চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, অসংখ্য ট্রফি আর অসংখ্য স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন একই ড্রেসিংরুমে। একজন গোল করতেন, অন্যজন সেই গোলের গল্প লিখে দিতেন পাসের ক্যানভাসে।

ফুটবল শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়। তা না হলে রোনালদোর শত শত গোল কিংবা মদরিচের অগণিত নিখুঁত পাস দিয়েই সব হিসাব শেষ হয়ে যেত। কিন্তু এই দুই মানুষকে মনে রাখা হবে তার চেয়েও বড় কারণে। একজন শিখিয়েছেন, প্রতিভার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম বড়। অন্যজন শিখিয়েছেন, শক্তির চেয়ে মস্তিষ্কের সৌন্দর্য অনেক সময় বেশি কার্যকর।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে শুরু হয়েছিল তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়া, কাতার হয়ে আজকের এই বিশ্বমঞ্চ। একটি একটি করে বিশ্বকাপ পেরিয়েছে, আর আমরা তাদের সাথে বড় হয়েছি। জীবনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দুই নামের সাথে।

প্রজন্ম হয়তো নতুন নায়ক খুঁজে নেবে। নতুন রেকর্ড হবে, নয়া ইতিহাস লেখা হবে। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশ থেকে উঠে এসে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডার হওয়া বা আটলান্টিকের এক ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গল্প—এমন গল্প বারবার লেখা হয় না।

এই ম্যাচে হার মানেই বিদায়। হয়তো মদরিচের জন্য চিরদিনের, হয়তো রোনালদোর জন্যও। তাই এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু পরের রাউন্ডে ওঠার নয়। এটি একটি যুগের শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ।

ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে যা-ই লেখা থাকুক, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম অনেক আগেই স্থায়ী কালি দিয়ে লেখা হয়ে গেছে।

আজকের ম্যাচটা জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় কিছু। কেননা এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো ফলাফলের জন্য নয়; শুধু উপভোগ করার জন্য।