শেষ ষোলোতে উঠার লড়াইয়ে আজ মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও জাপান। সোমবার (২৯ জুন) হিউস্টনে রাত ১১টায় গড়াবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ। কাগজে-কলমে এটি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সাথে এশিয়ার অন্যতম সেরা দলের লড়াই।
কিন্তু এই ম্যাচের গল্প শুধু ৯০ মিনিটের নয়; এটি এমন দুই দেশের মুখোমুখি হওয়া, যাদের ফুটবলের সম্পর্ক কয়েক দশকের। বলা যায়, বিশ্বকাপের এই লড়াইটা যেন গুরুর বিপক্ষে শিষ্যের পরীক্ষা।
আজকের জাপানকে দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। গত চার বছরে জার্মানি, স্পেন ও ইংল্যান্ডের মতো সাবেক চ্যাম্পিয়নদের হারিয়েছে তারা। এবারের বিশ্বকাপেও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে সামুরাই ব্লুরা।
কিন্তু জাপানের এই উত্থানের পেছনে যে দেশের অবদান সবচেয়ে বেশি, সেটি ব্রাজিল। ১৯৯৩ সালে জাপানে পেশাদার ফুটবলের সূচনা হয় জে-লিগের মাধ্যমে। সেই সময় থেকেই একের পর এক ব্রাজিলিয়ান তারকা পাড়ি জমান জাপানে।
শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচ হিসেবেও ব্রাজিলিয়ানরা জাপানের ফুটবল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তালিকার সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম জিকো। ‘সাদা পেলে’ নামে এই কিংবদন্তি অবসর ভেঙে যোগ দেন কাশিমা অ্যান্টলার্সে। এরপর তার হাত ধরেই জাপানে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের ঢল নামে।
বিসমার্ক, এলিভেলতো, লিওনার্দো, দুঙ্গাসহ অসংখ্য তারকা জে-লিগে খেলেছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিয়েছেন জাপানি ফুটবলে।
বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সাতজন ফুটবলার বিভিন্ন সময়ে জে-লিগে খেলেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা জাপানের ফুটবলের মান বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখে।
সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার সেজার সাম্পাইয়ো, যিনি ইয়োকোহামা ফ্লুগালসের হয়ে খেলতে খেলতেই ১৯৯৮ বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সাম্পাইয়ো বিশ্বাস করেন জাপানের উন্নতি মোটেও আকস্মিক নয়।
তার ভাষায়, ‘জাপানের ফুটবল নিয়ে যারা খোঁজ রাখে না, তারা অবাক হতে পারে। কিন্তু আমি নই। আমি নিজের চোখে দেখেছি, তারা প্রতি বছর ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে। তাদের শৃঙ্খলা সব সময়ই অসাধারণ ছিল।’
ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের স্মরণীয় কিছু সাফল্যও আছে। ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকে ১-০ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল তারা। সেই জয় ‘মিরাকল অব মায়ামি’ নামে স্মরণীয়। আর গত অক্টোবরে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারায় সামুরাই ব্লুরা।
তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের বিপক্ষে সুখস্মৃতি নেই জাপানের। দুই দলের একমাত্র বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেবার জাপানের কোচ ছিলেন জিকোই। কিন্তু নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে তার দল ৪-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
জাপানের ফুটবলে ব্রাজিলের প্রভাবের আরেকটি বড় উদাহরণ দেশটির জাতীয় দল। বিভিন্ন সময়ে ব্রাজিলে জন্ম নেয়া একাধিক ফুটবলার জাপানের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলেছেন। আলেক্স সান্তোস, মার্কোস তুলিও তানাকার মতো ফুটবলাররা দুই দেশের ফুটবল সংস্কৃতির সেতুবন্ধনের প্রতীক হয়ে আছেন।
সেই মার্কোস তুলিও তানাকার মতে, ‘ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় ও কোচরা জাপানের ফুটবলে বিশাল অবদান রেখেছেন। তাই ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ সব সময়ই বিশেষ। আর এখন দুই দলের ব্যবধান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম।’
ভুল বলেননি মার্কোস তুলিও তানাকা। ব্রাজিল যদিও এখনো এগিয়ে। কিন্তু সময় বদলেছে। জাপান এখন অনেক দূর এগিয়েছে। দলটা এখন যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই ভয়ের কারণ।
এক সময় যে দেশের কাছ থেকে ফুটবল শিখেছিল জাপান, আজ সেই দেশকেই হারিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে সামুরাই ব্লুরা। অন্যদিকে ব্রাজিল চাইবে নিজেদের ঐতিহ্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে যেতে।
যদিও ফুটবলে ব্রাজিল জাপানের শিক্ষক, অনুপ্রেরণা এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এসব সম্পর্কের কোনো মূল্য নেই। বন্ধুত্ব তাই আপাতত তুলে রাখা হবে। হিউস্টনের মাঠে ৯০ মিনিটের জন্য বন্ধু নয়, ব্রাজিল ও জাপান শুধুই প্রতিপক্ষ।



