হ্যাটট্রিক করা বিশ্বকাপে ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা!

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে অতীতে হ্যাটট্রিক করা খেলোয়াড় থাকলেও সেই আসরগুলোতে দলটি কখনোই শিরোপা জিততে পারেনি বা অনেক দূর যেতে পারেনি- এমনই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এবার লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের পর প্রশ্ন উঠেছে, আর্জেন্টিনা কি সেই পুরনো ধারা ভেঙে সফল হতে পারবে।

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল |সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলে এখন চলছে লিওলেল মেসি বন্ধনা। ৪৮ দলের অন্য খেলোয়াড়দের ছাপিয়ে এখন সব প্রশংসা কেড়ে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার এই অধিনায়ক। ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নেমেছেন। নেমেই গোল এবং হ্যাটট্রিক আলজেরিয়ার বিপক্ষে। দলের জয় ৩-০ তে। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেডিয়ামে তার এই হ্যাটট্রিক নিজের ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপে প্রথম। যার ম্যাজিকে কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা, সে ফুটবলারটি যদি ৪ বছর বিরতিতে আরেক বিশ্বকাপেও স্বরূপে থাকেন, ম্যাচ জয়ের মূল নায়ক হন তাহলে তার প্রশংসা সবার মুখে মুখে থাকবেই।

তবে অনেকেই হয়তো জানেন না যে বিশ্বকাপের ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা হ্যাটট্রিক করেছেন সেই আসরে ল্যাতিন দেশটির পক্ষে আর শিরোপা জেতা হয়ে ওঠেনি। বিদায় নিতে হয় সেমিফাইনালের আগেই। বিশ্বকাপের রেকর্ড কিন্তু সেটাই বলছে।

গুইলেরমো স্টাবিল, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, গনজালো হিগুয়েনরা হ্যাটট্রিক করে একটি ম্যাচে দলকে বড় জয় এনে দিয়েছেন ঠিকই। পরে আজেন্টিনা আর চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এবার মেসির আর্জেন্টিনা কি সেই ধারা ভাঙ্গতে পারবে। নাকি অতীতের পধে হেঁটে হতাশ করবে দুনিয়া জোড়া শত কোটি সমর্থকদের।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার গুইলেরমো স্টাবিলে হ্যাটট্রিক করেছিলেন মেক্সিকোর বিপক্ষে। সেই আসরে অবশ্য চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ২-৪ এ হেরে যায় উরুগুয়ের কাছে। ১৯৯৪ সালে এই যুক্তরাস্ট্রেই বিশ্বকাপ। দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে ৪-০তে উড়িয়ে দিয়েছিল গ্রিসকে। ম্যাচে ম্যারাডোনা তার বিশ্বকাপ এবং আন্তজাতিক ক্যারিয়ারে সর্বশেষ গোল করেছিলেন এই ম্যাচে। এরপর হ্যাটট্রিক করেন নতুন সেনসেশন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। তবে এরপর আর বেশি দূর এগুতে পারনি আলফিও বাসিলের দল। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বুলগেরিয়ার কাছে হারের পর দ্বিতীয় রাউন্ডে রোমানিয়ার কাছে ২-৩ গোলে হেরে বিদায়।

একই পথে হাঁটতে হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও। সেবার গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১-০ তে হারানোর পর দ্বিতীয় খেলায় জ্যামাইকার বিপক্ষে ৫-০তে জয়। এই ম্যাচেই হ্যাটট্রিক বাতিস্তুতার। অপর ২ গোল আরিয়েল ওর্তেগার। ‘বাতিগোল’ খ্যাত এই ফুটবলারটির হ্যাটট্রিক দুর্বল জ্যামাইকার বিপক্ষে বড় জয় এনে দিলেও বেশি অগ্রসর হতে পারেনি ড্যানিয়েল পেসারেলার দল। গ্রুপ পর্বের পরের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে, দ্বিতীয় রাউন্ডে ২-২ এরপর টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে হারালেও কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়। নেদারল্যান্ডসের কাছে ১-২ গোলে হেরে শেষ আটের এই ম্যাচ পরেই ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরতে হয়েছিল দিয়েগো সিমিয়নে, রবার্তো আয়ালা এবং হারনার ক্রেসপোদের।

দুই বিশ্বকাপ পর ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফের হ্যাটট্রিকের দেখা পান আর্জেন্টিনার ফুটবলার। এবার গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩ গোল আদায় স্ট্রাইকার গনজালো হিগুয়েনের। ম্যাচে কোচ দিয়েগো ম্যারাডোনার দলের জয় ছিল ৪-১ গোলে। তবে অতীতের মতো এই হ্যাটট্রিকও ১৯৭৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতা দলটির জন্য সুসংবাদ বয়ে আনতে পারেনি। সেই আসরের দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে মেক্সিকোকে হারালেও থেমে যেতে হয় কোয়ার্টার ফাইনালে। শেষ আটের ওই ম্যাচে লিওনেল মেসিদের ৪-০তে বিধ্বস্ত করে জার্মানি। ফলে ১৯৯৮ এর মতো ২০১০ বিশ্বকাপেও সেমির আগে অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালে ছিটকে পড়তে হয় ম্যাক্সি, রদ্রিগেজ, সার্জিও রোমেরোদের।

এবার তিন বিশ্বকাপ পরে আবার হ্যাটট্রিকের দেখা আর্জেন্টিনার ফুটবলারের। আলজেরিয়ার জালে মেসির ৩ গোল। তাই এখন প্রশ্ন মেসির এই হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনাকে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যচ্যুত করে মাথানত করে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করবে না তো?

এবারের হ্যাটট্রিকের সাথে অন্য হ্যাটট্রিকের দুটি জায়গার পার্থক্য। বাতিস্তুতা বা হিগুয়েন কেউই আর্জেন্টিনার অধিনায়ক পরিচয়ে হ্যাটট্রিক করেননি। মেসি আলজেরিয়ার জালে তিন বার বল পাঠিয়েছেন নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড পরে। আর অন্য দু’জন মূল স্ট্রাইকার হলেও মেসি মূল স্ট্রাইকার নন। অবশ্য সব পরিচয়ই তার জন্য যথাযথ। প্লে-মেকার, অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার, ফরোয়ার্ড সবই তিনি। এখন তার দলের পালা অতীতের ধারায় ছেদ টানা।