মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে পা রাখলেই কি ১০ বছর আগের সেই রাতটা মনে পড়ে লিওনেল মেসির? হয়তো পড়ে, হয়তো না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের কাছে সেই রাতটি আজও অমলিন।
সেই মাঠেই তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। সেই মাঠেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর কখনো আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তুলবেন না। ১০ বছর পর ঠিক সেই মাঠেই আজ স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল খেলতে নামছেন তিনি।
আর এবার হয়তো সত্যিই নিজের শেষ ম্যাচটা খেলতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। অন্তত বিশ্বকাপে যে এটাই তার শেষ ম্যাচ, তাতে সন্দেহ নেই বিন্দু-বিসর্গও।
ফুটবল কখনো চিত্রনাট্যও হার মানায়। ২০১৬ সালে যে মাঠ মেসির চোখে অশ্রু এনেছিল, ২০২৬ সালে সেই মাঠই তাকে দিতে পারে চিরস্থায়ী অমরত্ব। অবশ্য মাঝের সময়টাতেও পিছিয়ে ছিলেন না তিনি।
২০১৬ সালের ২৬ জুন। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ চিলি। ২২ বছরের শিরোপাখরা ঘোচানোর স্বপ্নে বিভোর ছিল পুরো আর্জেন্টিনা। সব আশা ছিল একজনের কাঁধে- লিওনেল মেসি।
কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
গোলশূন্য ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। আর্জেন্টিনার প্রথম শট নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। কিন্তু তার শট উড়ে যায় ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে।
পরে লুকাস বিগলিয়াও ব্যর্থ হন। আর্জেন্টিনা হেরে যায় ৪-২ ব্যবধানে। আর শেষ বাঁশির পর ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক বিধ্বস্ত মানুষকে। কিছুক্ষণ পরই আসে সেই অবিশ্বাস্য ঘোষণা- ‘বিদায় আর্জেন্টিনা।’
মাত্র ২৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে চেয়েছিলেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। কারণ, তার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল- জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জেতা বুঝি তার ভাগ্যে নেই।
সেই সময় মেসিকে নিয়ে সমালোচনার শেষ ছিল না। বলা হতো, তিনি বার্সেলোনার কিংবদন্তি, আর্জেন্টিনার নন। শৈশবে স্পেনে চলে যাওয়ায় দেশের প্রতি তার নিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলতেন অনেকে।
এমনকি দিয়েগো ম্যারাডোনার সাথে তুলনা টেনে তাকে ব্যর্থ বলতেও দ্বিধা করেনি তার নিজ দেশের একাংশ। কিন্তু ভাগ্য তখনো শেষ অধ্যায় লেখেনি। দেড় মাসের মধ্যেই জাতীয় দলে ফিরে আসেন মেসি।
এরপর শুরু হয় ইতিহাস বদলে দেয়ার গল্প। ২০২১ সালে ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা, একই বছরে আসে আরাধ্য বিশ্বকাপও।
কাতারে ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ-খরা ঘুচিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা। এরপর ২০২৪ সালে আসে আরো একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা। ফাইনালে হারায় কলম্বিয়াকে।
তবে মাঝপথে মেসি আবার ফিরেছিলেন মেটলাইফে। প্রতিপক্ষ? আবার সেই চিলি। তবে এবার আর ভুল হয়নি, যে মাঠে একদিন তার চোখের পানি পড়েছিল, সেই মাঠেই উদযাপনে মেতে ওঠেন। জয় পেয়েছিল ১-০ গোলে।
সব মিলিয়ে মেটলাইফে মেসির পরিসংখ্যান কম উজ্জ্বল নয়। এই মাঠে তিনি পাঁচ ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন চার গোল। ২০১২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে এখানেই করেছিলেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক।
তাই মেটলাইফ স্টেডিয়াম যেন মেসির জীবনের প্রতিচ্ছবি- এখানে যেমন আছে কান্না, তেমনি আছে উল্লাস; যেমন আছে ব্যর্থতা, তেমনি পুনর্জন্মের গল্প। তবে এর মঝে লুকিয়ে আছে শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ।
এবার সেই মাঠেই অপেক্ষা করছে আরেকটি ফাইনাল। আজ রাতে স্পেনকে হারাতে পারলে আর্জেন্টিনা জিতবে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। জার্মানি-ইতালির চার শিরোপার রেকর্ডেও ভাগ বসাবে তারা।
অন্যদিকে মেসির সামনে থাকবে অনন্য সব অর্জনের হাতছানি। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড, প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জয় বা রেকর্ড তৃতীয়বার গোল্ডেন বল জয়ের সুযোগ তার সামনে।
১০ বছর আগে যে মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে আমার শেষ’ ঠিক সেই মেটলাইফেই এবার হয়তো তিনি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের ট্রফিতে চুমু আঁকবেন।
যদি তা-ই হয়, তাহলে ২০১৬ সালের সেই কান্না আর ২০২৬ সালের সম্ভাব্য হাসি মিলেই লেখা হবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রত্যাবর্তনের গল্প!



