বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল দলের হেড কোচ হিসেবে গোলাম রব্বানী ছোটনের পরিবর্তে দায়িত্ব পেয়েছেন বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটু। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ বাছাইয়ের প্রস্তুতিতে জর্ডান সফরে টিটুকে প্রধান কোচ ও ছোটনকে সহকারী কোচ হিসেবে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
গত কয়েক মাস ছোটনের অধীনেই অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দলটি অনুশীলন করে আসছিল। কিন্তু জর্ডান সফরের ঠিক আগে কোচিং স্টাফে এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার দেশ ছাড়ার আগে সোমবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণকে।
ছোটনের বদলে টিটুকে হেড কোচ করার কারণ জানতে চাইলে প্রথমে কোনো উত্তর দিতে চাননি কিরণ। পরে প্রশ্ন জোরালো হলে তিনি বলেন, ‘ট্যাকনিক্যাল ডাইরেক্টর মূলত একজন কোচ এবং তিনি প্রো লাইসেন্সধারী। ফেডারেশন তাকে বেশি ভালো মনে করায় দায়িত্ব দিয়েছে।’
ছোটনের অধীনে বাংলাদেশ নারী ফুটবলের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। সেই ছোটনকেই এবার অনূর্ধ্ব-১৭ দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব না দেয়ায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফুটবলাঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে ছোটন রাজশাহী স্টারস নিয়ে মালয়েশিয়ায় থাকার সময় অনূর্ধ্ব-১৭ দলের নারী কোচিং স্টাফ মিরোনার সাথে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুর দূরত্ব তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিরোনাকে শোকজ করে বাফুফে। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় মিরোনাকে জর্ডান সফরে নেয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কিরণ বলেন, ‘মিরোনার বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত অবস্থায় তাকে দলের সফরে নেয়া হচ্ছে না।’ তবে এখানেই দেখা দিয়েছে বাফুফের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন। সিনিয়র নারী দলের ম্যানেজার খালিদ মাহমুদ নওমির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংগঠন সাফ শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করেছিল।
সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বাফুফেও তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি। অথচ এর মাঝেই নওমিকে জাপানে এশিয়ান গেমসের দলের টিম ম্যানেজার করে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে তদন্ত চলার কারণে মিরোনাকে দলের সফর থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ একইভাবে তদন্তের মুখে থাকা দুজনের ক্ষেত্রে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাফুফে- এমন প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে কিরণের ব্যাখ্যা, ‘নওমি এবং মিরোনার বিষয়টি ভিন্ন। নওমির সাথে দলের কারো কোনো সমস্যা হয়নি। আর মিরোনাকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন রয়েছে। তাই দুরকম সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
সাবেক জাতীয় ফুটবলার মিরোনা গত কয়েক বছর ধরে নারী ফুটবল দলের সাথে কাজ করছেন। ছোটনসহ অন্য কোচদের সাথে কাজের সময় তার বড় ধরনের কোনো মতবিরোধের কথা প্রকাশ্যে আসেনি। তবে টিটু টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তার সাথে মিরোনার দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
ফুটবলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ টিটুর কোচিং পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, কোচিং ক্লাস কিংবা অনুশীলনের সময় অধীনস্থদের প্রতি কিছুটা তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ করার প্রবণতা রয়েছে টিটুর মাঝে।
এর মাঝেই ছোটনের পরিবর্তে টিটুকেই অনূর্ধ্ব-১৭ দলের প্রধান কোচ করে জর্ডানে পাঠানো হচ্ছে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে টিটুর পেছনে বাফুফের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সেই ব্যয়ের বিপরীতে তার কাছ থেকে কতটা ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটি নিয়েও ফুটবলাঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে।
একেক কোচের একেক ধরনের কৌশল ও পরিকল্পনা থাকে। ছোটনের পরিবর্তে টিটু দায়িত্ব নেয়ায় দলের অনুশীলন ও প্রস্তুতিতে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন এসেছে।
বাফুফের নারী উইংয়ের প্রধান কিরণের দাবি, টিটু আরো ভালো ও উন্নতমানের হওয়ায় তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৭ দলের সহ-অধিনায়ক আলপি আক্তারের কাছেও প্রশ্ন করা হয়, কোচ পরিবর্তনের প্রভাব কী এবং টিটুর কোচিংয়ে তারা কী ধরনের উন্নতি দেখেছেন?
মাত্র ১৭ বছর বয়সী আলপি প্রশ্নের মুখে কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন। পরে পাশে থাকা অধিনায়ক মেঘলার পরামর্শে তিনি বলেন, ‘দুই কোচই ভালো। আমরা তাদের অধীনে অনুশীলন করছি। ফেডারেশন যেটা ভালো মনে করেছে, সেটাই করেছে।’
এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ বাছাইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ দল জর্ডান সফরে যাচ্ছে। তবে জর্ডানের নারী ফুটবল দল খুব বেশি উন্নত নয়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সেখানে গিয়ে ম্যাচ খেলে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হবে, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে কোচ পরিবর্তন, তদন্তাধীন কোচিং স্টাফকে সফর থেকে বাদ দেয়া এবং একই সময়ে তদন্তের মুখে থাকা আরেক কর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত- সব মিলিয়ে বাফুফের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ফুটবলাঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।



