বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক লাল কার্ড পাওয়া খেলোয়াড়রা

ফাইনালে জিদানের লাল কার্ড ছাড়াও, ২০০৬ বিশ্বকাপে রেফারি গ্রাহাম পোল ভুলবশত ক্রোয়েশিয়ার জোসিপ সিমুনিচকে তিনটি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন এবং এরপর তাকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে উদ্বোধনী ম্যাচে এবারই সবচেয়ে বেশি ৩টি লাল কার্ডের ঘটনা ঘটেছে মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মোট ১৭৪ জন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার (লাল কার্ড) করা হয়েছে, তবে তাদের মধ্যে মাত্র দুজন একাধিকবার লাল কার্ড দেখেছেন। তারা হলেন- ক্যামেরুনের রিগোবার্ট সং এবং ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য অঁরি মিশেলের ক্যামেরুন দলে অপ্রত্যাশিতভাবে ডাক পান সং। সুইডেনের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে খেলার পর, ব্রাজিলের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচেই তাকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিশ্বকাপে বহিষ্কৃত সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় (১৭ বছর ৩৫৮ দিন) হিসেবে তিনি আজও রেকর্ড ধরে রেখেছেন এবং তিনিই একমাত্র কিশোর খেলোয়াড়, যিনি এই টুর্নামেন্টে লাল কার্ড দেখেছেন।

চার বছর পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের হয়ে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো লাল কার্ড দেখেন চিলির সাথে। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল এবং এর ফলে ক্যামেরুন পরবর্তী পর্বে যেতে ব্যর্থ হয়।

জিদান তার দুটি লাল কার্ডের প্রথমটি পেয়েছিলেন সেই ১৯৯৮ সালে। সৌদি আরবের বিপক্ষে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গ্রুপ ম্যাচে, ফুয়াদ আনোয়ারের ওপর পা তুলে আঘাত করার (স্ট্যাম্পিং) দায়ে তাকে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। তবে তাতে ফ্রান্সের ১০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়টির টুর্নামেন্টে নিজের ছাপ রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি।

তিনি ফাইনালে দুটি গোল করেছিলেন এবং ফ্রান্স ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করেছিল। তবে তার দ্বিতীয় লাল কার্ডটি ছিল অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত (হেডবাট) করার কারণে জিদানকে অতিরিক্ত সময়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এটিই ছিল তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শেষ ঘটনা; এরপর পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্স ইতালির কাছে ফাইনালে হেরে যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালে পাঁচটি লাল কার্ডের মধ্যে এই একটি জিদানের।

ফাইনালে লাল কার্ড পাওয়াদের তালিকা
পেদ্রো মনজোন, আর্জেন্টিনা বনাম পশ্চিম জার্মানি, ১৯৯০। গুস্তাভো দেজোত্তি, আর্জেন্টিনা বনাম পশ্চিম জার্মানি, ১৯৯০। মার্সেল দেসাই, ফ্রান্স বনাম ব্রাজিল, ১৯৯৮। জিনেদিন জিদান, ফ্রান্স বনাম ইতালি, ২০০৬। জন হেইটিঙ্গা, নেদারল্যান্ডস বনাম স্পেন, ২০১০।

১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত ও কদর্য ফাইনাল হিসেবে পরিচিত। ফাইনালে একটি দলের দুজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ১৯৯০ সালেই। ফাইনালের ওই পাঁচটি লাল কার্ডের ঘটনার মধ্যে কেবল দেসাইই বিজয়ী দলের সদস্য হিসেবে ম্যাচ শেষ করেছিলেন।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড পাওয়া দলগুলো
আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবলের জন্য পরিচিত হলেও, পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড পাওয়ার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল: ব্রাজিল: ১১, আর্জেন্টিনা: ১০, ক্যামেরুন: ৯, উরুগুয়ে: ৯, নেদারল্যান্ডস: ৮, ইতালি: ৮, জার্মানি: ৮, পর্তুগাল: ৬, মেক্সিকো: ৬, ফ্রান্স: ৬, হাঙ্গেরি: ৫টি লাল কার্ড পেয়েছে।

প্রতি ম্যাচে লাল কার্ডের হারের কথা বিবেচনা করলে ক্যামেরুনকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। মাত্র ২৬টি ম্যাচে তারা নয়টি লাল কার্ড পেয়েছে, অর্থাৎ প্রতি ২.৯টি ম্যাচে গড়ে একজন খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হয়েছেন।

অন্যদিকে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে জাপান সবচেয়ে ‘পরিচ্ছন্ন’ বা শৃঙ্খলাবদ্ধ দল। কোনো লাল কার্ড না দেখেই তারা বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ম্যাচ (২৫টি) খেলার রেকর্ড গড়েছে।

একটি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ লাল কার্ড
জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে পুরুষদের কোনো একক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ সংখ্যক লাল কার্ড দেখানোর রেকর্ড রয়েছে; সেবার মোট ২৮ জন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

এক বিশ্বকাপে ১০ বা ততোধিক লালকার্ড
জার্মানি, ২০০৬: ২৮টি

ফ্রান্স, ১৯৯৮: ২২টি

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান, ২০০২: ১৭টি

দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১০: ১৭টি

ইতালি, ১৯৯০: ১৬টি

যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৯৪: ১৫টি

ব্রাজিল, ২০১৪: ১০টি

ফাইনালে জিদানের লাল কার্ড ছাড়াও, ২০০৬ বিশ্বকাপে রেফারি গ্রাহাম পোল ভুলবশত ক্রোয়েশিয়ার জোসিপ সিমুনিচকে তিনটি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন এবং এরপর তাকে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন।

একটি বিশ্বকাপ ম্যাচে সর্বাধিক লাল কার্ড
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক খেলোয়াড় বহিষ্কারের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৬ সালে পর্তুগাল বনাম নেদারল্যান্ডস ম্যাচে, যখন রেফারি ভ্যালেন্টিন ইভানোভ মোট চারটি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন। উভয় দলের জন্য দুটি করে। ম্যাচটি এতটাই আলোচিত যে উইকিপিডিয়ায় এর জন্য আলাদা একটি পাতা রয়েছে ‘দ্য ব্যাটল অফ নুরেমবার্গ’ নামে।

চারটি লাল কার্ড ছাড়াও ওই ম্যাচে রুশ রেফারি ইভানোভ ১৬টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন, যা ছিল তৎকালীন রেকর্ড। পরবর্তীকালে ২০২২ সালে সেই হলুদ কার্ডের রেকর্ডটি ভেঙে যায়; আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডস কোয়ার্টার ফাইনালে, স্প্যানিশ রেফারি আন্তোনিও মাতেউ লাহোজ মোট ১৮টি হলুদ কার্ড (১৬টি খেলোয়াড়দের এবং ২টি কোচিং স্টাফদের) দেখিয়েছিলেন।