স্পেনকে বদলানো দুই অভিবাসী সন্তানের ফুটবল গল্প

অভিবাসী পরিবারের নানা সঙ্কট পেরিয়ে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছানো এবং স্পেনের নতুন প্রতীকে পরিণত হওয়ার গল্প।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামাল
নিকো উইলিয়ামস ও লামিন ইয়ামাল |সংগৃহীত

নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ফুটবল দলের সবচেয়ে পরিচিত দুই তারকা যেন দুই ভাই। নিকো উইলিয়ামস ১২ জুলাই ২৪ বছরে পা দিয়েছেন, আর লামিন ইয়ামাল ১৩ জুলাই পূর্ণ করেন ১৯ বছর।

তাদের বয়স কম হলেও রোববার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের ১-০ ব্যবধানে জয়ের মধ্য দিয়ে এই দুই ফুটবলারের ঝুলিতে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত দুটি শিরোপা যুক্ত হয়েছে- ২০২৬ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ।

মাঠের বাইরে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং টিকটকে তাদের মজার কোরিওগ্রাফি করতে দেখা যায়।

তারা অবিচ্ছেদ্য এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোয় অভিবাসনের মাধ্যমে বদলে যাওয়া একটি দেশেরও প্রতীক।

২০২৪ সালে স্প্যানিশ জাতীয় দল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির নেতৃত্ব ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোইসেস রুইস বলেছিলেন, ‘তারা স্পেনের গর্ব, তারা নতুন স্পেনের ইতিবাচক প্রতীক। তারা দুই তরুণ স্প্যানিয়ার্ড, যাদের পারিবারিক ইতিহাস কষ্ট ও সংগ্রামে ভরা। তারা প্রতিকূলতার সন্তান, বিনয় ও প্রতিভার দুটি উদাহরণ।’

কিন্তু এই খেলোয়াড়দের গল্প কী এবং তারা কিভাবে সুপারস্টার হয়ে উঠলেন?

একটি ভালো জীবনের খোঁজে

নিকো এবং তার বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামস, যিনি অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের আরেকজন ফুটবলার, স্পেনেই তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাদের গল্প আশাবাদ, অভিবাসন, দুর্ভোগ, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা ও সংহতির কথা বলে।

দুই ভাইয়ের মা মারিয়া ১৯৯৪ সালে স্বামী ফেলিক্সকে নিয়ে ইউরোপে একটি ভালো জীবনের সন্ধানে ঘানা ছেড়েছিলেন। তখন তিনি ইনিয়াকিকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন।

তারা যাত্রার বেশিভাগ পথই হেঁটে অতিক্রম করেছিলেন, যার মধ্যে সাহারা মরুভূমির একটি অংশও ছিল। বহু বছর পরে নিকো নিজেই একটি স্প্যানিশ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তার মা যাত্রাপথের কিছু অংশ ‘খালি পায়ে’ অতিক্রম করেছিলেন।

ওই দম্পতি উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের এনক্লেভ মেলিয়ায় পৌঁছান। রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য তাদের পরামর্শ দেয়া হয় যেন তারা বলেন যে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন।

তাই তারা দাবি করেন যে তারা লাইবেরিয়া থেকে এসেছেন, যে দেশটি তখন সঙ্ঘাতে বিপর্যস্ত ছিল।

সাবেক যাজক ইনিয়াকি মারদোনেস আহা বলেছিলেন, ‘অনেক বছর ধরে আমি বিশ্বাস করতাম তারা লাইবেরিয়া থেকে এসেছেন। সে সময় আমি অভিবাসীদের সহায়তায় কারিতাসের একটি দলে কাজ করতাম।’

ইনিয়াকি বর্তমানে সান্তান্দারের মারকেস দে ভালদেসিলা হাসপাতালে ক্যাথলিক ধর্মীয় সেবা বিভাগে কর্মরত।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ওই সময় সরকার মেলিয়ায় থাকা একদল অভিবাসীকে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘নিকোর মা-বাবা কারিতাসের সহায়তায় বিলবাওয়ে এসেছিলেন। আমি ইংরেজি জানতাম বলে আমাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই আমি তাদের রেলস্টেশনে নিতে যাই। প্রতিবেদনে লেখা ছিল তারা স্প্যানিশ ভাষায় পাঁচ পেয়েছেন। আমি তাদের সাথে স্প্যানিশে কথা বলা শুরু করলাম, কিন্তু তাদের হতভম্ব দেখাচ্ছিল। পরে ইংরেজিতে কথা বলতেই তারা স্বাভাবিক হলো।’

‘একটি সম্মান’

মারদোনেস জানান, প্রথম কয়েকদিন তারা একটি বোর্ডিং হাউসে ছিলেন, পরে তাদের জন্য একটি অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়। একদিন তিনি তাদের খোঁজ নিতে গেলে গর্ভবতী মারিয়া তাকে বলেন যে তিনি কিছু অসুবিধা অনুভব করছেন।

মারদোনেস আর সময় নষ্ট করেননি, ‘আমি তাকে বললাম, চলুন হাসপাতালে যাই!’

এরপর তারা হাসপাতালে যান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তিনি মারিয়ার স্বামী ফেলিক্সকে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় যান। কিছু সময় পর তাদের জানানো হয় যে শিশুটির জন্ম হয়েছে। তার নাম রাখা হয় ইনিয়াকি।

তিনি বলেন, ‘জন্ম নিতে যাওয়া একটি শিশুর নাম আপনার নামে রাখার অনুমতি চাওয়া সবসময়ই অসাধারণ উপহার, বিরাট সম্মানের বিষয়। আর পরে সেই ছেলে আজ যেখানে পৌঁছেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের আলাদা করে চেনার জন্য তাদের মা বলতেন, ছোট ইনিয়াকি, বড় ইনিয়াকি। আর বহু বছর পরে আমি যখন তাদের সাথে ছিলাম, তখন বলেছিলাম এখন বিষয়টি উল্টা হয়েছে, বড় ইনিয়াকি এখন খেলোয়াড়।’

পরবর্তীতে তাদের মা-বাবাকে একটি খামারে কাজ দেয়া হয়। ইনিয়াকিকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় পরিবারটি পাম্পলোনায় চলে যায়। এটি স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নাভারা প্রদেশের রাজধানী।

সেখানেই ২০০২ সালে বড় ভাইয়ের আট বছর পরে জন্ম নেন উইলিয়ামস পরিবারের ছোট সন্তান নিকোলাস উইলিয়ামস আর্থার।

নিকো বলেন, ‘আমার মা-বাবা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন যাতে আমি এবং আমার ভাই আরো ভালো ভবিষ্যৎ পেতে পারি। আর তারা সফল হয়েছেন। মা-বাবা আমাদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকব। তারা সংগ্রামী মানুষ। তারা আমাদের সম্মান, কঠোর পরিশ্রম এবং এই শিক্ষা দিয়েছেন যে কেউ আপনাকে বিনামূল্যে কিছু দেয় না।’

তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, তাদের আমার মা-বাবা হিসেবে পেয়ে আমি খুবই গর্বিত। আর আমি সবসময় চেষ্টা করি যেন তারা আমাকে তাদের ছেলে হিসেবে নিয়ে গর্ব করতে পারেন।’

ভাতৃত্বের অটুট বন্ধন

পরিবারের ভরণপোষণের জন্য ভালো কাজের সুযোগ না পেয়ে নিকোর বাবা ফেলিক্স উইলিয়ামস লন্ডনে চলে যান, যেখানে তিনি মূলত অভিবাসন চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি কাজ করে দেশে টাকা পাঠাতেন।

তিনি চেলসি এলাকার একটি শপিং সেন্টারের ফুড কোর্টে টেবিল পরিষ্কারের কাজ করেন এবং নিরাপত্তারক্ষী হিসেবেও কাজ করেন। এমনকি চেলসি এফসির স্টেডিয়ামের প্রবেশপথেও।

তিনি ১০ বছর পরিবারের থেকে দূরে ছিলেন। এরপর বিলবাওয়ে ফিরে আসেন। এই সময়ে নিকোর কাছে বাবার ভূমিকা পালন করতেন বড় ভাই ইনিয়াকি, আর তাদের মা পরিবার চালাতে একসাথে তিনটি পর্যন্ত কাজও করেছেন।

নিকোর বড় ভাই তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন এবং ক্লাসের পরে খাবার দিতেন। কিভাবে আচরণ করলে একজন শীর্ষ পর্যায়ের ক্রীড়াবিদ হওয়া যায়, সেটিও তিনি নিকোকে শেখাতেন।

নিকো বলেন, ‘সে আমার জন্য একজন আদর্শ, আমার কাছে সে সবকিছু। সে আমার মা-বাবাকে সাহায্য করেছে; আমাকে খেতে, স্কুলে যেতে এবং পোশাক পরতে সাহায্য করেছে। সে আমাকে সংশোধন করে, পরামর্শ দেয়। সবসময় তাই করে। তবে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো। সে আমার ভাই, কিন্তু কিছুটা বাবার মতোও আচরণ করে।’

দুই ভাইই ফুটবলার হয়েছেন।

২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল অ্যাথলেটিক বিলবাও ও রিয়াল ভালিয়াদোলিদের (২-২) ম্যাচে দুই ভাই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ক্লাবটির হয়ে একসাথে খেলা দুই ভাই তারা।

নিকোর মতো ইনিয়াকি স্পেনের হয়ে খেলেন না। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানার প্রতি নিজের শিকড়ের সম্মান জানাতে তিনি ঘানার জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।

মারদোনেস বলেন, ‘একবার আমি তাদের সাথে গিয়েছিলাম ইনিয়াকিকে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের একটি ম্যাচে নিয়ে যেতে, তখনও সে মূল দলে অভিষেক করেনি। নিকো ফুটবল-সংক্রান্ত সবকিছুই অসম্ভব আবেগ দিয়ে দেখত। কিন্তু তার পাশাপাশি সে খুবই ভালো মানুষ ছিল। তারা শুধু বড় তারকা নয়, বড় মনের মানুষও। তারা জানে তারা কোথা থেকে এসেছে।’

একটি স্প্যানিশ গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিকো এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার মা খুব কষ্ট করেছেন। মরুভূমি খালি পায়ে হেঁটেছেন, নানা কিছু সহ্য করেছেন যা আমি কারো জন্য কামনা করি না। শেষ পর্যন্ত কেউ এখানে কারো কিছু চুরি করতে আসে না। আমরা আসি খাবারের জন্য, মাথার ওপরে ছাদের জন্য, আমাদের সন্তানদের এবং নিজেদের একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য ...কেউ জন্মগতভাবে বর্ণবাদী নয়। আমাদের শিশুদের ভালোভাবে শিক্ষা দিতে হবে।’

বিস্ময়বালক লামিন

লামিন ইয়ামালের মা-বাবাও আফ্রিকা থেকে অভিবাসী হিসেবে স্পেনে এসেছিলেন। তার নামের দুটি অংশ- লামিন ও ইয়ামাল, রাখা হয় পরিবারের দুই বন্ধু লামিন এবং ইয়ামালের সম্মানে ও কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, যারা তার জন্মের আগে তাদের সাহায্য করেছিলেন।

তবে স্পেনে প্রথম আসেন তার দাদি ফাতিমা।

কয়েক মাস আগে হোসে রামোন দে লা মোরেনা ফাউন্ডেশনের পডকাস্টে ইয়ামাল বলেছিলেন, তার দাদি মরক্কো থেকে ‘একাই, বাসে করে’ স্পেনে এসেছিলেন। যাত্রাপথে তিনি আলহেসিরাস ও গ্রানাদায় পৌঁছেছিলেন।

লামিন বলেন, ‘তিনি সকাল, দুপুর ও রাত কাজ করেছেন যাতে আমার বাবা আসতে পারেন। কারণ আমার বাবা তার বোনকে নিয়ে মরক্কোয় একা ছিলেন।’

তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন এবং মাত্র তিন বছর বয়সে স্পেনে আসেন।

লামিনের মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে এসেছেন। তারা দুজনই বার্সেলোনার উপকণ্ঠে বসবাস শুরু করেন।

‘আমার ছেলে যখন জন্মেছিল, আমি জানতাম সে একদিন তারকা হবে,’ ইউরো ২০২৪ ফাইনালের আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন গর্বিত বাবা নাসরাউই।

স্প্যানিশ গণমাধ্যমকে তিনি আরো জানান, মৃগীরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে উপস্থিত থাকতে পারেননি এবং ছেলের আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জয় সরাসরি দেখতে পারেননি।

পরিবারটি পরে রোকাফোন্দা নামের শ্রমজীবী এলাকায় চলে যায়, যেখানে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক। এই এলাকাটি তরুণ খেলোয়াড় লামিন ও তার পরিবারের গর্বের উৎস।

তার বাবা বলেন, ‘এই এলাকাই পৃথিবীর সেরা এবং স্পেনের সেরা, কারণ এখানে আমরা সবাই সমান এবং সবাই একে অপরকে ভালোবাসি।’

শৈশবে লামিনের ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা লিওনেল মেসির সাথে একটি বহুল আলোচিত সাক্ষাৎ হয়েছিল। আর্জেন্টাইন তারকা তখন মাত্র ২০ বছর বয়সী ছিলেন এবং ইউনিসেফের একটি দাতব্য প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন। বার্সেলোনার স্টেডিয়ামে তিনি শিশু লামিন ইয়ামালকে কোলে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন।

‘এটা জীবনের একটি কাকতালীয় ঘটনা। অথবা লিওর পক্ষ থেকে লামিনের জন্য আশীর্বাদ। সত্যি বলতে আমি জানি না,’ মজা করে বলেন লামিনের বাবা।

পর্যটনকেন্দ্রিক বার্সেলোনা থেকে অনেক দূরের শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দাতেই শুরু হয়েছিল এই তরুণ তারকার ফুটবল-যাত্রা। তিনি একটি কংক্রিটের মাঠে খেলতে শুরু করেন।

তার বাবা বলেন, ‘সে একটি বিশেষ ঘটনা। ওই সবসময় ক্রীড়াকেন্দ্রে খেলতে যেত, সবার সাথে। সাত বছরের শিশু থেকে শুরু করে ১৫, ১৭ ও ১৮ বছর বয়সীদের সাথেও। আর হ্যাঁ, সে অন্যদের তুলনায় দ্রুত পরিণত হয়েছে। সে যা দিয়েছে, তার সবকিছু নিয়ে আমি গর্বিত।’

উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ

লামিন ইয়ামালের প্রতিভা দেখে তাকে বার্সেলোনায় ট্রায়ালের জন্য নেয়া হয় এবং তিনি লা মাসিয়ায় সুযোগ পান, যে অ্যাকাডেমিতে মেসিও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেখানে তার থাকার ব্যবস্থা, খাবার, শিক্ষা ও ফুটবল উন্নয়নের সুযোগ ছিল।

‘আমি তাকে এমন এক শিশু হিসেবে মনে করি, যে নিজের প্রতিভা সম্পর্কে খুব সচেতন ছিল। খেলাধুলায় প্রতিভাবানরা অনেক সময় খুব স্বার্থপর হয়, কিন্তু ইয়ামাল তেমন ছিল না,’ বিবিসি স্পোর্টের কলামিস্ট গিইয়েম বালাগেকে বলেন তার সাবেক কোচ ইভান কাররাস্কো।

‘আমি একজন উদার ছেলেকে দেখেছি, যে স্বীকৃতির পেছনে ছুটত না। একজন কোচ হিসেবে কখনো কখনো আপনি ভাবেন- আমি তাকে কী শেখাতে পারি, যদি সে এমন কিছু করে যা বেঞ্চে বসে আমি কল্পনাও করতে পারি না?’ ইয়ামালকে নিয়ে নিজের কলামে লিখেছিলেন বালাগে।

‘আপনি যত বেশি লামিনের কাছাকাছি যাবেন, ততই বুঝবেন নির্ণায়ক শব্দটি তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। সে একেবারেই অসাধারণ একজন ফুটবলার।’

এরপর একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। ১৫ বছর ২৯০ দিন বয়সে তিনি বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হন। ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে তিনি স্পেন জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় ও গোলদাতা হন।

আর বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি ১৯ বছর ছয় দিন বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ, দুটি শিরোপাই জেতা ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হন।

খ্যাতি ছাড়াও তার উদযাপনে সবসময় ফিরে আসে তার এলাকা রোকাফোন্দা। তিনি আঙুল দিয়ে ৩০৪ সংখ্যাটি দেখান, যা ওই এলাকার পোস্টাল কোড।

লামিন ইয়ামাল নিজের শিকড় নিয়ে গর্বিত।

অধ্যাপক মোইসেস রুইস বলেন, ‘গুণ শুধু তার বাঁ পায়ের বিষয় নয়। তার প্রতিটি গোল স্বাধীনতার, সহাবস্থানের এবং সৌভাগ্যের প্রতি ভালোবাসার একটি নিঃশ্বাস। সামাজিকভাবে এটি অঙ্গীকারের মূল্যকে তুলে ধরে; এটি বর্ণবাদ ও বিদেশ বিদ্বেষের বিরুদ্ধে একটি ঘোষণা।’

বার্সেলোনাভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক স্পোর্টের পরিচালক হোয়ান ভেহিলসের মতে, লামিন ইয়ামালের গল্পও ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

ভেহিলস বলেন, ‘এখনো অনেকে আছেন যারা অভিবাসনের সমালোচনা করেন, যারা এই মানুষদের সাহায্য দেয়ার সমালোচনা করেন। আমার মনে হয় অনেক মানুষ বুঝতে পারবেন যে যতটা সম্ভব দেশগুলো যখন একে অপরকে সহায়তা করে, তখন ফলাফল এমনই হয়; স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত নয়, কিন্তু স্পেনে জন্মানো এক শিশুকে সমাজের সাথে পুরোপুরি একীভূত একজন মানুষে পরিণত করা।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে অনেকেরই চুপ থাকতে হবে, কারণ তাদের শ্রমের ফলই স্পেনের মানুষের জন্য আনন্দ বয়ে এনেছে।’

নিকো-ইয়ামাল যেন দুই ভাই

স্পেন জাতীয় দলের এই প্রজন্মে নিকো নতুন এক আত্মার সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন লামিন ইয়ামালের মধ্যে। তার সাথে তিনি বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করেন, যেমন ইনিয়াকি তার সাথে করেন।

ভেহিলস বলেন, ‘হাসিখুশি, আনন্দময় এবং মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া দুই তরুণ ফুটবলারকে পাওয়া স্পেনের জন্য একটি দুর্দান্ত চিত্র। বর্তমানে এটি ভালো খেলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’

তাদের সবকিছুই এক ধরনের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

স্পেন জাতীয় দলের হয়ে গোল উদযাপনের জন্য তারা যে নাচগুলো অনুশীলন করেন, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

তাদের বন্ধুত্বের শুরু ২০২৪ সালে জাতীয় দলে প্রথম ডাক পাওয়ার সময়। কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের বিপক্ষে স্পেনের প্রীতি ম্যাচের আগে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিকোকে তরুণ লামিন ইয়ামালের দেখভাল করতে বলেছিলেন। নিকো সেই দায়িত্ব পালন করেন।

এটি ছিল দে লা ফুয়েন্তের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত, কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে মাত্র ১৬ বছরের এই তরুণের জন্য এর চেয়ে ভালো পথপ্রদর্শক আর হতে পারে না।

‘সে তার জন্য একটি ভালো উদাহরণ,’ বলেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের একজন মুখপাত্র।

তিনি বলেন, ‘লামিন-নিকো যা করে সবকিছুই অনুসরণ করে। নিকো ঘুম থেকে ওঠে, প্রস্তুত হয়, তারপর লামিনকে নিতে যায়। সে বার্সেলোনা খেলোয়াড়ের কক্ষের দরজায় নক করে বলে, চলো, আমাদের দেরি করা চলবে না।’

অনেকের কাছে এটি নিকো ও তার ভাই ইনিয়াকির সম্পর্কের প্রতিফলন মনে হয়।

কিন্তু নিকোর কাছে বিষয়টি আরো বেশি কিছু, ‘আমি ইতোমধ্যেই (ইয়ামালকে) বলেছি যে তাকে তার বাবার কাছ থেকে শিখতে হবে, আর সেই বাবা আমি,’ মজা করে বলেন নিকো।

মারদোনেসের মতে, ‘নিকো এবং ইয়ামাল দুজনের গল্পই অনেক মানুষের জন্য উদাহরণ, যারা নতুন জীবনের খোঁজে বেরিয়ে এসে সফল হতে পেরেছেন। অনেকের কাছে তারা ক্রীড়াক্ষেত্রের এবং মানবিকতার আদর্শ।’

অধ্যাপক রুইসও একমত, ‘এখন শুধু তাদের পরিবারকে ধন্যবাদ জানানো বাকি, কারণ তারা আমার দেশকে বেছে নিয়েছিলেন। আর স্পেনকেও ধন্যবাদ, কারণ দেশটি তাদের জীবন বদলে দেয়ার সুযোগ দিয়েছে।’

সূত্র : বাসস