আজকের ফ্রান্সকে দেখলে মনে হয়, এটি কেবল একটি ফুটবল দল নয়—একটি সুখী পরিবার। আর সেই পরিবারের প্রাণকেন্দ্রে আছেন দুই প্রজন্মের দুই নেতা—দিদিয়ের দেশম ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
তাদের বোঝাপড়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর একসাথে লড়াই করার মানসিকতা ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। যেমনটা দেখিয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেবার ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের বড় শক্তি ছিল কোচ আইমে জ্যাক ও অধিনায়ক দেশমের রসায়ন।
প্রায় তিন দশক পর ইতিহাস যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। এবার কোচের দায়িত্বে থাকা দেশম নিজের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে গড়ে তুলেছেন ঠিক তেমনই এক আস্থার সম্পর্ক।
নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার ম্যাচে সেই সম্পর্কের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ধরা পড়ে।
প্রথম গোল করার পর কোনো সতীর্থের কাছে নয়, সরাসরি টাচলাইনের দিকে ছুটে যান এমবাপ্পে। গিয়ে জড়িয়ে ধরেন নিজের কোচকে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ফরাসি দল দেশমকে ঘিরে ধরে আলিঙ্গনে মেতে ওঠে।
কয়েক দিন আগেই মায়ের মৃত্যুতে দেশে গিয়েছিলেন দেশম। ফিরে এসেই দলের কাছ থেকে পেলেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার প্রকাশ। দৃশ্যটি যেন বলে দিল, এই ফ্রান্স শুধু প্রতিভার দল নয়, ঐক্য, বিশ্বাস ও পারিবারিক বন্ধনের দলও।
এই দলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এমবাপ্পে। চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ছয় গোলের সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। তবে তার অবদান শুধু সংখ্যার হিসাবে আটকে নেই।
দলের কঠিন সময়ে প্রকাশ্যে সতীর্থ উসমান দেম্বেলেকে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। আবার প্রতিটি সুযোগে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জেতাই তার একমাত্র লক্ষ্য।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের তিক্ত স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় এমবাপ্পেকে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি ফ্রান্স। সেই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, একজন খেলোয়াড় যত বড় তারকাই হোন না কেন, একা বিশ্বকাপ জেতানো সম্ভব নয়।
তাই এবার গোল করার পাশাপাশি নেতৃত্বের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। সুইডেনের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর মাইকেল ওলিসেকে সাহস জুগিয়েছেন, আবার প্রয়োজন হলে রক্ষণেও নেমে এসেছেন দলের জন্য।
জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ—সবার হাত ধরে এগিয়ে নেওয়া একজন প্রকৃত অধিনায়ক।সুইডেনকে হারানোর পর দেশমও তাই অধিনায়কের প্রশংসায় ছিলেন উচ্ছ্বসিত।
‘কিলিয়ান শুধু গোলই করে না, রক্ষণেও সমান দায়িত্ব নেয়। প্রথম দিন থেকেই বলেছিলাম, সে একটা মিশনে নেমেছে। অনুশীলনের ফিটনেস ড্রিলেও সবার আগে শেষ করে সে।’
‘অনেক আগেই বলেছিলাম, অধিনায়কের দায়িত্বটা সে পুরোপুরি নিজের করে নিয়েছে। বাইরে থেকে মানুষ তাকে যেভাবে দেখে, বাস্তবের কিলিয়ান আসলে তেমন নয়।’
ম্যাচ শেষে কোচের প্রতি দলের সমর্থনের কথাও তুলে ধরেন এমবাপ্পে। ‘আমরা সবাই জানি এখানে আমাদের কী করতে হবে। আমরা ভালো খেলেছি, যদিও শুরুটা কঠিন ছিল। এটাই আমাদের দলের ডিএনএ।’
‘আমরা সবাই একত্রে আছি। কোচ জীবনের খুব কঠিন সময় পার করছেন। এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একদিন সবাইকেই যেতে হয়। কিন্তু তিনি কখনও একা নন। আমরা সবসময় তার পাশে থাকব।’
পরের ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অবশ্য নিজের স্বভাবসুলভ হাস্যরসেই উত্তর দেন ফরাসি অধিনায়ক। ‘প্যারাগুয়ে? এই মুহূর্তে আমার পুরো মনোযোগ ড্রেসিংরুমের এয়ার কন্ডিশনারের দিকে।’
শেষ পর্যন্ত পুরো দলের মানসিকতাই যেন এক বাক্যে তুলে ধরেন দেশম। ‘ওরা একটা মিশনে আছে, আমিও ওদের সাথে সেই একই মিশনে আছি।’
সে মিশনের নাম কী? এই প্রসঙ্গে যদিও কোচ জানাননি কিছু। তবে ফ্রান্স যেভাবে ছুটছে বিশ্বকাপে, সেই মিশনের নাম দেয়া যেতে পারে —'মিশন পসিবল'।
এদিকে ম্যাচের শেষ দিকে জোড়া গোল করে যখন এমবাপ্পে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন টাচলাইনে দাঁড়িয়ে দেশম দুই হাত ও মাথা ঝুঁকিয়ে তাকে কুর্নিশ জানান। একজন কোচের পক্ষ থেকে শিষ্যের প্রতি এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী-ই বা হতে পারে!



