একটি ট্রফি, দুই পরাশক্তি; কারা হাসবে শেষ হাসি?

চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকা স্পেন। নিউ জার্সির এই মহালড়াইটি একইসাথে ‘লা মাসিয়া’র দুই প্রজন্ম মেসি-ইয়ামাল এবং গুরু-শিষ্য দুই কোচের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মঞ্চ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বামে লিওলেন মেসি ও ডানে লামিনে ইয়ামাল
বামে লিওলেন মেসি ও ডানে লামিনে ইয়ামাল |সংগৃহীত

বিশ্বকাপ যেন পূর্ণতা পেয়েছে। শিরোপার লড়াই হচ্ছে ইউরোপ আর ল্যাটিন আমেরিকার সেরা দুই দলের মাঝে। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ফাইনালে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এমন ফাইনাল আগে কখনো দেখেনি বিশ্ব।

দুই দলের দেখা হতে পারতো গত মার্চেই। কাতারে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরো স্পেনের। কিন্তু সেই সময় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ম্যাচটি আলোর মুখ দেখেনি।

ফুটবলপ্রেমীদের সেই অপেক্ষা এবার ফুরানোর পালা, আরো বড় মঞ্চে। সোনালী ট্রফিটি আবারো জিততে মুখোমুখি হচ্ছে শৈল্পিক ফুটবলের দুই প্রতিনিধি। নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে রাত ১টায় শুরু হবে ম্যাচটি।

৪৮ দল আর ১০৩ ম্যাচের দীর্ঘ যাত্রা। প্রায় দেড় মাসের লড়াই শেষে শিরোপার লড়াই দাঁড়িয়েছে এখন দুই দলের মাঝে। এবার আর একটা ম্যাচই নির্ধারণ হবে ফুটবলের নতুন রাজা। শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসন যাচ্ছে কার দখলে?

শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ২০১০ সালে বিশ্বজয়ের স্মৃতিকে আবারো জীবন্ত করে ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চায় স্পেন। এই ফাইনাল তাই শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়, এটি দুই ভিন্ন যাত্রাপথের শেষ অধ্যায়।

ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার পথচলা ছিল প্রতিটি ধাপে কঠিন পরীক্ষায় ভরা। গ্রুপ পর্ব সহজে পেরিয়ে গেলেও নকআউট পর্বে বারবার চাপে পড়তে হয়েছে। তবে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। নাটকীয় সব মুহূর্ত উপহার দিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছে তারা।

হারার আগে হার নয়—এই নীতিতে বিশ্বাসী লিওনেল মেসিরা বিশ্বকাপে লিখছে একের পর এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প। আসরে ৭৫ মিনিট বা তার পরেই আর্জেন্টিনা করেছে ১২ গোল। এই অসাধারণ সামর্থ্যই তাদের শিরোপার কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

অন্যদিকে স্পেনের যাত্রা ছিল পরিপাটি ও নিয়ন্ত্রিত। বল দখলে আধিপত্য, পরিকল্পিত আক্রমণ, শৃঙ্খলিত রক্ষণ আর দলগত ফুটবলের নিখুঁত প্রদর্শনীতে একের পর এক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিয়েছে ‘লা রোজা’। ছিল পরিপক্বতা ও ধারাবাহিকতার ছাপ।

কোচ দে লা ফুয়েন্তে নিপুন কৌশলে দলকে টানছেন মাঠের বাহিরে থেকে। ফাইনালের আগে স্পেন টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ইতোমধ্যে ইতালির বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছে। ফাইনালে জিততে পারলে টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড দখলে নিবে ‘লা রোজা’রা।

যাহোক বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটি হয়ে উঠছে শুধু দুই দলের নয়, দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন, দুই ভিন্ন যাত্রাপথ ও দুই ভিন্ন স্বপ্নের চূড়ান্ত মুখোমুখি লড়াই। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা বনাম ইউরোপের পুরান দ্বৈরথের ঝনঝনানিও আছে পরতে পরতে।

স্পেনের পরিচয় শুধু পাসিং ফুটবল বা পজিশনাল প্লেতে সীমাবদ্ধ নয়। বলের নিয়ন্ত্রণে প্রতিপক্ষকে দমবন্ধ করে রাখার পাশাপাশি মুহূর্তেই গতি বাড়িয়ে রক্ষণ চিরে ফেলার অসাধারণ সামর্থ্যও আছে তাদের। সেই আক্রমণের বড় অস্ত্র লামিনে ইয়ামাল।

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন এই উইঙ্গার। একের পর এক রেকর্ড গড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফুটবলের নতুন বিস্ময় হিসেবে। মাত্র ১৯ বছরের ইয়ামালই এবার স্পেনের বড় শক্তি।

এবার সেই ইয়ামালের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি—যাকে বলা হয় ফুটবলের সর্বকালের সেরা সৃষ্টি। কেন বলা হয়, সেই প্রমাণ ইতোমধ্যেই রেখেছেন তিনি। আরো একবার রাখতে চাইবেন ফাইনালের মঞ্চে। আর তেমনটা হলে স্পেনকে ভুগতে হবে।

তবে দু'জনের মিল আছে। দু'জনেরই শুরু বার্সেলোনার লা মাসিয়া থেকে। একই অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা দুই প্রজন্মের দুই প্রতিভা এবার মুখোমুখি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। যা এবারের ফাইনালের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

শিরোপার লড়াইটিও দুই দলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর্জেন্টিনা খেলছে তাদের সপ্তম বিশ্বকাপ ফাইনাল। আগের ছয় ফাইনালের তিনটিতে (১৯৩০, ১৯৯০ ও ২০১৪) রানার্স আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

অন্যদিকে, ১৯৭৮ ও ১৯৮৬ সালের পর দীর্ঘ ৩৬ বছরের খরা শেষে গত আসরে ফের চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। আজ জিতলে এটি হবে তাদের চতুর্থ শিরোপা ও টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব জয়—যা ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কেউ পারেনি।

অন্যদিকে, স্পেন খেলছে মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১০ সালে প্রথমবার ফাইনাল খেলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। ১৬ বছর পর আবারো বিশ্বসেরা হওয়ার হাতছানি ‘লা রোজা’র সামনে।

ডাগআউটেও থাকছে ভিন্ন এক গল্প। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির শিক্ষক ছিলেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। এবার সেই দুই কোচই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চ গুরু-শিষ্যকে একে অপরের প্রতিপক্ষ করে দিয়েছে।

নিউইয়র্কের এই রাত তাই শুধু একটি ফাইনালের অপেক্ষা নয়। এটি ইতিহাস পুনর্লিখনের মঞ্চ। আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপ ধরে রেখে নতুন কীর্তি গড়বে, নাকি স্পেন ১৬ বছর পর আবারো বিশ্বসেরার সিংহাসনে বসবে—উত্তর মিলবে শেষ বাঁশি বাজার পর।