গ্রুপ পর্বের টানাপোড়েন, বিবর্ণতা ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যোমে নকআউট পর্ব শুরু করতে মুখিয়ে আছেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেস। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ বত্রিশের ম্যাচ সামনে রেখে তাই বললেন, বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে এখন থেকে!
টরেন্টোয় বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায়, শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগাল। দুই দলের কারোই গ্রুপ পর্ব ভালো যায়নি, উভয়েই রানার্সআপ হয়ে ওঠে এসেছে নকআউট পর্বে।
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ে সাদামাটাভাবে গ্রুপ পর্ব শুরু করেছিল পর্তুগাল। সেই থেকে শুরু হয় সমালোচকদের তোপ দাগানো। উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেয়ার পর, তাতে খানিকটা প্রলেপ দেয়।
কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর আবারো সমালোচনা শুরু হয়। তবে, প্রতিকূল স্রোত পেরিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠে আসে মার্তিনেসের দল। এখন আর পেছন ফেরার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বের মতো ভুল-ত্রুটি শুধরে নেয়ার রাস্তাও বন্ধ। পা হড়কানো মানেই বিদায়।
মার্তিনেসের তাই মনে হচ্ছে, ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দিয়েই আসল বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তাদের। তার মতে ‘ঐক্য, মেধা এবং প্রতিশ্রুতি থাকার কারণে আমাদের দলটা খুবই শক্তিশালী। আমি আত্মবিশ্বাসী। যে তিনটা ম্যাচ ইতোমধ্যে আমরা খেলেছি, সেগুলো প্রস্তুতির অংশ ছিল; কঠিন মুহূর্তে আমরা দৃঢ়তা ও তীব্রতা দেখিয়েছি।
‘যখন আপনি ভালো একটা পর্যায়ে থাকবেন, তখন জেতাটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, হারাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কলম্বিয়ার বিপক্ষে না হারাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমাদের জন্য। বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে, আগামীকাল (আজ) থেকে।’
বিপরীতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় গোলের রোমাঞ্চ ছড়ানো ম্যাচে ৪-২ ব্যবধানে হেরে, বিশ্বকাপ শুরু করে ক্রোয়েশিয়া। ২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলটি পরে ঘানা ও পানামাকে হারায়। তবে, পর্তুগালকে হারাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন দেখছে দলটা।
ক্রোয়েশিয়া গোলকিপার ডমিনিক লিভাকোভিচ বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ একটা ক্রোয়েশিয়া দল। এখানে সবাই পরস্পরকে সাহায্য করার জন্য ও সেটা আমার বেলায়ও প্রযোজ্য। আমি সবসময় নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করি, যাতে শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একসাথে উদযাপন করতে পারি।’
এদিকে নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। শুধু শেষ বত্রিশের লড়াই নয়, সময়ের বিরুদ্ধে দুই কিংবদন্তির যুদ্ধ। এক পাশে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্য পাশে লুকা মদ্রিচ। তাদের যে কারো একজনের হতে পারে এটাই শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।
একসময় রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুম ভাগ করা দুই কিংবদন্তি এবার মুখোমুখি। একজন গোলকে ইতিহাসে পরিণত করেছেন, আরেকজন সময়কে নিয়ন্ত্রণ করে ফুটবলকে শিল্প বানিয়েছেন। চলতি বিশ্বকাপে তারকাদের পারফরম্যান্সও এই ম্যাচকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
রোনালদো ৩ ম্যাচে ২ গোল করে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পর্তুগালকে। অন্যদিকে মদ্রিচ এখনো গোল না পেলেও ক্রোয়েশিয়ার খেলার ছন্দ তার পা দিয়েই তৈরি হয়েছে।
তবে এই ম্যাচে ‘অপয়া’ এক পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলার যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন রোনালদো। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা আট ম্যাচে গোলের দেখা পাননি।
একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ছয় বিশ্বকাপে গোল করার ইতিহাস গড়া রোনালদোর সামনে এবার সেই খরা কাটানোর লক্ষ্য।
রোনালদো কি পারবেন টরন্টোতে উদযাপনের উপলক্ষ এনে দিতে? চাইবেন তো খুব করেই।
অবশ্য পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া এর আগে কখনোই ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। এবারের বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ তাদের ম্যাচটিই বিশ্বকাপে প্রথম সাক্ষাৎ।
তবে অন্য টুর্নামেন্ট বা প্রীতি ম্যাচে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে ১০ বার। যেখানে পর্রুগাল বেশ এগিয়ে। ৭ বার জিতেছে তারা। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার জয় ১ ম্যাচে। বাকি দুই ম্যাচ ড্র হয়।
দুই দলের অবশ্য ইউরো ২০১৬’তে শেষ ষোলোর ম্যাচে দেখা হয়েছিল। যেখানে অতিরিক্ত সময়ে রিকার্দো কোয়ারেসমার গোলে জিতেছিল পর্তুগাল। পরে সেই টুর্নামেন্টেই তারা শিরোপা জেতে।
তবে নকআউট বাস্তবতায় আগের ইতিহাস খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। অতীত সাফল্য, পরিসংখ্যান বা ভবিষ্যদ্বাণী; ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের সামনে এসে অর্থহীন হয়ে যায়। একটি গোল, একটি ভুল কিংবা একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো গল্প!
এই ম্যাচটা পর্তুগিজদের জন্য বিশেষ এক উপলক্ষের। যে উপলক্ষ অবশ্য স্বস্তির নয়, বেদনাবিধুর। ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন পর্তুগাল ও লিভারপুলের তারকা ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোতা।
মাত্র ২৮ বছর বয়সে ভাই আন্দ্রে সিলভাকে সাথেই নিয়ে স্পেনের একটি সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। তাদের বহনকারী ল্যাম্বরগিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার বাইরে ছিটকে পড়ে আগুনে পুড়ে যায়। সেই দুর্ঘটনাতেই নিহত হন দুই ভাই।
জোতার মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকী তাই বিশ্বকাপে থাকা পর্তুগাল দলের জন্য শুধুই একটি দিন নয়, আবেগে মোড়া একটি উপলক্ষ। গত এক মাস ধরেই সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও সমর্থকেরা নানা আয়োজনে তার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
বিশ্বকাপ অভিযানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই কোনো না কোনোভাবে উঠে এসেছে জোতার নাম। এবার তার বিদায় দিনটা রাঙিয়ে তোলার প্রত্যয় পর্তুগিজদের মনে।



