১০ বছর আগে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টি শট আকাশে উড়িয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা হারানোর পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।
এক দশক পরও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পেনাল্টি থেকে গোল করতে তার সমস্যার অবসান হয়নি। তবে ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেয়ার পথে তার ফুটবল-জাদু সেই দুর্বলতাকে অনেকটাই আড়াল করে দিচ্ছে।
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ীর সর্বশেষ পেনাল্টি মিসে মঙ্গলবার শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে বিদায়ের শঙ্কায় পড়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। এর আগে ও পরে ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর গোলে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল মিসর।
এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো মেসির পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও তিনি পেনাল্টি বাইরে মেরেছিলেন। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে একাধিক পেনাল্টি মিস করা একমাত্র খেলোয়াড় এখন মেসি।
এর আগে, ২০১৮ সালে আইসল্যান্ড এবং চার বছর পর পোল্যান্ডের বিপক্ষেও পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। বিশ্বকাপে মোট চারটি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হওয়ার এই রেকর্ড অবশ্য তার জন্য একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত।
ক্যারিয়ারে পেনাল্টি থেকে তার সাফল্যের হার ১৫০ প্রচেষ্টায় ১১৬ গোল, অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ- যা বৈশ্বিক গড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে বিস্ময়ের কথা হলো, যিনি অন্য সব দিক থেকে মোটেও সাধারণ নন এমন একজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা মোটেও মানানসই নয় ।
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পর ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। অশ্রুসিক্ত অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন তিনি।
সেই সময় পর্যন্ত আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো বড় শিরোপা জেতা হয়নি তার। বার্সেলোনার হয়ে অসাধারণ সাফল্য পেলেও দেশের হয়ে দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তখনো অপূর্ণই ছিল।
তবে কয়েক মাসের মধ্যেই অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে মাঠে ফেরেন তিনি। এক দশক পরে সেই সব সংশয় এখন অতীত। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জিতেছে দু’টি কোপা আমেরিকা এবং চার বছর আগে কাতারে বহু প্রতীক্ষিত তৃতীয় বিশ্বকাপ।
আটলান্টায় এবারো অশ্রু ঝরেছে, তবে সেগুলো ছিল আনন্দের। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর আবেগে ভেসে যান মেসি। তার বাড়ানো ক্রস থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডে প্রথম গোলটি আসে, যা বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের সূচনা করে।
এরপর নিজেই সমতাসূচক গোল করেন মেসি। টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি চলতি আসরে মাত্র পাঁচ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় আটটিতে।
শেষ আঘাতটি হানেন এনজো ফার্নান্দেজ। ফলে লিওনেল স্কালোনির দল শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে টিকে থাকে।
স্কালোনি বলেন, ‘বেঞ্চে থাকা ছেলেদের যারা অবাক হয়ে তাকে দেখছিল, তাদের বলব ওকে আদর্শ হিসেবে নাও। এটা সত্যিই অসাধারণ।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওর মানসিকতাটা দেখুন! পেনাল্টি মিস করার পর ও চাইলে ভেঙে পড়তে পারত, ভাবতে পারত, সব শেষ, আমরা ২-০ গোলে পিছিয়ে। কিন্তু তার বদলে সে আবার বল চাইল এবং লড়াই চালিয়ে গেলো। সত্যি বলতে, এটা আমার শরীরে শিহরণ জাগায়। তবে শুধু মেসির কথা বললে হবে না। তার সতীর্থরাও অসাধারণভাবে তাকে সমর্থন করেছে। এটাই এই দলের আসল পরিচয়।’
তবে নকআউট পর্বে কেপ ভার্দে ও মিসরর মতো তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনার দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্কালোনির দল বারবার প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণে বিপাকে পড়েছে। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক খেলোয়াড়ে ভরপুর এই দলে শক্তির ঘাটতিও চোখে পড়েছে।
সামনে আরো কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড, আর জিতলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবু মেসির হার না মানা মানসিকতা এবং আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে না দেয়ার দৃঢ় সংকল্পই এখনো আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। যেন বিখ্যাত আকাশি-সাদা জার্সিতে আরো একটি, অর্থাৎ চতুর্থ বিশ্বকাপ তারকা যোগ করা যায়।



