বিশ্বকাপসহ নিজেদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অংশীদারিত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর বুধবার ফিফার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা মঙ্গলবার জানায়, নতুন গঠিত বেসরকারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজে (এফএফই) তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ধরে রাখবে। তবে সংখ্যালঘু ও নিয়ন্ত্রণহীন অংশীদারিত্ব দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৪.২ বিলিয়ন ডলার তোলার আশা করছে ফিফা।
বুধবার বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্য ফুটবল এসোসিয়েশনগুলোকে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছেন, পরিকল্পনাটির পক্ষে সমর্থন দিলে প্রতিটি সদস্য সংস্থা ৪ কোটি ডলার করে পাবে।
তবে এজন্য তাদের ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনায় সম্মতি দিতে হবে।
ইনফান্তিনো চিঠিতে লিখেছেন, ‘২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী চক্রে এই প্রস্তাবের আওতায় প্রতিটি সদস্য এসোসিয়েশন সর্বোচ্চ ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ পাবে।’
এই খবর প্রথম প্রকাশকারী দ্য টাইমস জানায়, পরিকল্পনার বিরোধীরা একে ‘নিরেট ঘুষ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর বিবৃতি দিয়েছে। উয়েফার নির্বাহী কমিটির সহ-সভাপতি হান্স-জোয়াকিম ভাৎসকে জার্মান সাময়িকী কিকারকে বলেন, ‘ইউরোপীয় ফুটবলের অনেকেই ফিফার এই পরিকল্পনাকে ফুটবলের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখছেন। আমিও তাই মনে করি। এখানে একটি সীমা অতিক্রম করা হয়েছে।’
দ্য টাইমস আরো দাবি করেছে, ২০৩১ সালে সম্ভাব্য পরবর্তী মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইনফান্তিনো এফএফইর কমিশনার হয়ে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারেন। তবে ফিফা জানিয়েছে, এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে আর্থিক উপদেষ্টা ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল, যার প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এ ছাড়া রয়েছে মার্কিন ব্যাংক জেপি মরগান চেজ-এর একটি বিভাগ, যারা ব্যর্থ ইউরোপীয় সুপার লিগ প্রকল্পে অর্থায়নের চেষ্টা করেছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর সমালোচক উয়েফা এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই পরিকল্পনা সীমালঙ্ঘন করেছে।’
সংস্থাটি আরো বলেছে, ‘ফুটবলের আত্মা ও এর শাসনব্যবস্থা কোনো কেনাবেচার সম্পদ নয়। ফুটবলের মালিক আমরা কেউ নই। এটি বিক্রি করার অধিকারও ফিফার নেই।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ পরিকল্পনার কঠোর বিরোধিতা করেছে। ইইউর ক্রীড়াবিষয়ক কমিশনার গ্লেন মিকালেফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের খেলা থেকে হাত সরান।’
উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফ জানিয়েছে, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না হওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বলেছে, এ বিষয়ে তাদের সাথে কোনো পরামর্শ না করায় তারা হতাশ।
তবে পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে হলে প্রথমে ফিফার ৩৮ সদস্যের কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য এসোসিয়েশনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফিফা জানিয়েছে, খুব শিগগিরই কাউন্সিলের সামনে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে।
ফিফা বলেছে, এফএফই গঠিত হলেও সংস্থাটি এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখবে। পাশাপাশি ফুটবলের পরিচালনা, প্রতিযোগিতা, ম্যাচ সূচি এবং সব ধরনের নিয়ন্ত্রক ও ক্রীড়াসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতাও ফিফার হাতেই থাকবে।
সংস্থাটির দাবি, এফএফইর প্রাথমিক ইকুইটি মূল্যায়ন হবে ২০ বিলিয়ন ডলার।
ফিফা আরো জানিয়েছে, তাদের প্রতিটি সদস্য এসোসিয়েশনকে এককালীন ২ কোটি ডলারের অংশীদারিত্ব কেনার সুযোগ দেয়া হবে।
যদিও এটি মোট মালিকানার মাত্র ০.১ শতাংশ, তবুও ফিফার ছোট বা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র সদস্যদেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ।
গত জুনে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের জন্য তাদের আয় ৭ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এবারই প্রথম ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ভবিষ্যতে টুর্নামেন্টটি ৬৪ দলে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
দ্য টাইমস-এর উদ্ধৃত এক জ্যেষ্ঠ ফুটবল কর্মকর্তা বলেছেন, এই পরিকল্পনা ইউরোপীয় সুপার লিগের চেয়েও সম্ভাব্যভাবে অনেক বেশি ক্ষতিকর, কারণ এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ফুটবলের সব স্তরে পড়তে পারে।
২০১৯ সালে ইনফান্তিনোর সমর্থিত ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা ফিফার স্টেকহোল্ডার কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই পরিকল্পনায় সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপে বিনিয়োগের কথা ছিল।
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জাপানের সফটব্যাংক এবং সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের নামও উঠে এসেছিল।
তবে পরে ফিফা ২০২৫ সাল থেকে ক্লাব বিশ্বকাপকে সাত দল থেকে বাড়িয়ে ৩২ দলের প্রতিযোগিতায় রূপ দেয়।
দ্য টাইমস আরো বলেছে, এফএফই প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের কাঠামোতেও প্রভাব পড়তে পারে। পত্রিকাটির ভাষ্য, ‘এর ফলে দুই প্রতিযোগিতাকেই আরো বড় করা বা বর্তমান চার বছর অন্তর আয়োজনের পরিবর্তে আরো ঘন ঘন আয়োজনের চাপ তৈরি হতে পারে।’



