হেরেও জিতে গেলেন ভোজিনিয়া!

কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অসাধারণ ৮টি সেভ করে হারের পরও ম্যাচের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার দুর্দান্ত লড়াই ছোট দলের আত্মবিশ্বাস ও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া
কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া |সংগৃহীত

ফুটবলে এমন কিছু রাত থাকে, যেখানে স্কোরলাইন সব গল্প বলে না। ৩-২ গোলে হারের পরও যদি কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে পুরো বিশ্বের আলোচনা হয়, তবে বুঝতে হবে তিনি বিশেষ কিছু করেছেন। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া ঠিক তেমনই এক নাম।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণ সামলাতে হয়েছে তাকে। সামনে ছিলেন লিওনেল মেসি, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের তারকাবহুল আক্রমণভাগ। কিন্তু ভোজিনিয়া যেন নিজের গোলপোস্টের সামনে এক অদম্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

ম্যাচজুড়ে তিনি করেন ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ, যার মাঝে ৪টিই ছিল মেসির শট থেকে। প্রতিটি সেভে ফুটে উঠেছে তার অসাধারণ রিফ্লেক্স, সঠিক পজিশনিং ও মানসিক দৃঢ়তা। একাধিক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে তিনি কেপ ভার্দেকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

যদিও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জয় তুলে নেয়, তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ভোজিনিয়া। দর্শক, বিশ্লেষক ও সাবেক ফুটবলাররা তার পারফরম্যান্সের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, এই ম্যাচে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাদের গোলরক্ষক।

ফুটবলে গোলদাতারাই সাধারণত নায়ক হন। কিন্তু কখনো কখনো একজন গোলরক্ষকও ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র হয়ে ওঠেন। ভোজিনিয়া সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি। তার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, সাহস, আত্মবিশ্বাস আর লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে ছোট দলের একজন খেলোয়াড়ও বিশ্বমঞ্চে নিজের পরিচয় গড়ে নিতে পারেন।

হয়তো স্কোরবোর্ডে কেপ ভার্দের নাম বিজয়ী হিসেবে লেখা হয়নি। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে সেই রাত চিরকাল মনে থাকবে এক গোলরক্ষকের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের জন্য- যার নাম ভোজিনিয়া। বিশ্বকাপ কখনো এমন কিছু নায়ক জন্ম দেয়, যাদের ট্রফির দরকার হয় না।

যখন টুর্নামেন্ট শুরু হয়, কেপ ভার্দের এই ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষককে খুব কম মানুষই চিনতেন। বিশ্বফুটবলের আলোটা বরাবরের মতো ছিল মেসি, এমবাপ্পে, ভিনিসিউস কিংবা বেলিংহামদের ওপর। ভোজিনিয়া ছিলেন সেই আলোর বাইরের একজন মানুষ।

কেপ ভার্দের জনসংখ্যা মাত্র ছয় লাখের কিছু বেশি। ফুটবলের শক্তিধর দেশগুলোর কাছে তারা ছিল প্রায় অচেনা। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা পরিচয় দিয়েছে অন্যভাবে, ভয়হীন ফুটবল আর অবিশ্বাস্য লড়াই দিয়ে। এই গল্পের কেন্দ্রেই ছিলেন ভোজিনিয়া।

গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে ৭টি সেভ করে গোলশূন্য ড্র এনে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ম্যাচেই বোঝা গিয়েছিল, ইতিহাস গড়তেই এসেছেন তিনি ও তার দল। উরুগুয়ের সাথে এগিয়ে গিয়েও পিছিয়ে পড়া, তারপর আবার সমতায় ফেরা- ম্যাচটিই বলে দেয় তারা হার না মানা এক জাতি।

সৌদি আরবের বিপক্ষে আরেকটি ক্লিন শিট নিশ্চিত করে তারা পৌঁছে যায় নকআউটে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউটে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ হয়ে যায় কেপ ভার্দে।

ভোজিনিয়া তখন বলেছিলেন, ‘আমরা ছোট, কিন্তু আমাদের হৃদয়টা বড়। আমরা লড়াকু।’ এর চেয়ে সুন্দর পরিচয় আর কী হতে পারে!

এরপর নকআউটে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হওয়া, এটাও তো একটা রূপকথার অংশই। তবে আসল রূপকথা লেখা হয়েছে মাঠে। আর্জেন্টিনার সাথে পাল্লা দিয়ে, সমানে সমানে লড়াই করেছে কেপ ভার্দে। যেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ভোজিনিয়াই।

মায়ামিতে আজ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণ যেন থামতেই চাইছিল না। একের পর এক শট, একের পর এক সুযোগ। মেসি বারবার চেষ্টা করেছেন। আর প্রতিবারই সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভোজিনিয়া।

কখনো ডানদিকে উড়ে গিয়ে, কখনো দুই হাতে ঠেলে, কখনো বুক দিয়ে আটকে তিনি যেন একাই লড়েছেন পুরো আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। তার দলও যেন লড়াই করেছে পুরোটা উজার করে। তাতে ৯০ মিনিটের লড়াই গড়িয়েছে ১২০ মিনিট পর্যন্ত।

ভোজিনিয়াও হয়তো গোল্ডেন গ্লাভস হাতে তুলবেন না। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের গল্প যখন লেখা হবে, সেখানে বড় বড় চ্যাম্পিয়নদের পাশে জায়গা হবে ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকেরও। তার গল্পটা লিখতেই হবে।