মহাকাব্যের শেষ অধ্যায় সব সময় বিজয়ের হয় না। কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নায়ককেও মঞ্চ ছাড়তে হয় নীরবে, নীরব কান্নায় চোখ ভাসিয়ে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের লিওনেল মেসি যেন সেই নীরব বিদায়েরই প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বকাপটা তার কাছে নতুন ছিল না। ট্রফিটা অপরিচিত নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ফাইনালটা ছিল অন্যরকম। শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিরোপা ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন লিওনেল মেসি, লিখতে চেয়েছিলেন অমরত্বের গল্প।
কিন্তু ওই যে সব গল্পের শেষটা রঙিন হয় না। নায়ক শেষ হাসিটা হাসেন, দর্শক হাততালি দেয়—চিরাচরিত এমন দৃশ্য পাশ কাটিয়ে লিওনেল মেসির শেষটা হলো বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আর চোখভরা জলে। বয়সটাও যেন হঠাৎ বেড়ে গেল ঢের।
রুপালি মেডেল যখন গলায় পরলেন, তখন ক্যামেরা স্থির হয়ে ছিল মেসির মুখে। সেই চোখ—যে চোখ অসংখ্যবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে অদৃশ্য পথ খুঁজে পেয়েছে, যে চোখ কোটি মানুষের স্বপ্ন বুনেছে—সেই চোখই এবার ভিজে উঠল অশ্রুতে।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরেকবার হাতছানি দিয়েও অধরা থেকে গেল। মাঠের এক পাশে স্পেনের উচ্ছ্বাস, অন্য পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। যেন এক কিংবদন্তির কাঁধে জমে ছিল গোটা জাতির হতাশা।
এটি ছিল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। বয়সকে হার মানিয়ে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে খেলেছেন দুর্দান্ত ফুটবল। আট গোলের সাথে করেছেন চারটি অ্যাসিস্ট। প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল করেছেন, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ গোল।
এই বিশ্বকাপেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন মেসি। তবে সেই রেকর্ড নিজের কাছে রাখতে পারেননি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে তাকে ছাড়িয়ে যান।
স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ আর নিখুঁত কৌশলের সামনে এদিন অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিল আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে মাত্র দুইটি শট নিতে পেরেছিল তারা, যার একটিও লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। মেসিও ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে।
তবু কি একটি হার মেসির মহত্ত্বকে মুছে দিতে পারে? হয়তো না। কারণ ফুটবল শুধু ট্রফির হিসাব নয়, ফুটবল স্মৃতিরও নাম। আর সেই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর অনেকটাই লিখেছেন লিওনেল মেসি।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে তার কান্নার ছবিটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। সেই কান্না ছিল না শুধুই একটি ম্যাচ হারের। সেখানে ছিল দেশের জন্য শেষবারের মতো সবকিছু উজাড় করে দেয়ার তৃপ্তি, অপূর্ণতার বেদনা আর হয়তো এক অজানা বিদায়ের আভাস।
এখন প্রশ্ন একটাই—রানার্সআপের রুপালি মেডেল গলায় ঝুলিয়ে অশ্রুসিক্ত সেই মুহূর্তটিই কি আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ছবি? নাকি ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ‘শেষ নৃত্য’ এখনো বাকি?
উত্তরটা সময়ই দেবে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, যেদিন মেসি সত্যিই বিদায় বলবেন, সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলও হারাবে তার সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্পীদের একজন।
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার রাতে ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়েছে আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে ভেঙে যায় আকাশি-নীলদের স্বপ্ন।



