নকআউট ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, এখানে দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই। অতীত সাফল্য, পরিসংখ্যান বা ভবিষ্যদ্বাণী; ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের সামনে এসে অর্থহীন হয়ে যায়। একটি গোল, একটি ভুল কিংবা একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো গল্প।
মঙ্গলবার ডালাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আইভরিকোস্ট ও নরওয়ের মধ্যকার লড়াইটিও তেমনই এক ম্যাচ। এটি শুধু বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর লড়াই নয়, বরং দুটি ভিন্ন মহাদেশের দুটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষও।
একদিকে আফ্রিকার গতি, শক্তি ও আবেগ, অন্যদিকে উত্তর ইউরোপের শৃঙ্খলা, সংগঠিত ফুটবল। একদিকে নতুন ইতিহাস লেখার হাতছানি, অন্যদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসা এক দলের স্বপ্ন।
প্রথমে বলি আইভরিকোস্টকে নিয়েই। দলটা এমন এক ইতিহাস নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে এসেছে, যেখানে প্রতিভার অভাব কখনোই ছিল না, কিন্তু সাফল্য ছিল অধরা। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে দিদিয়ের দ্রগবা, ইয়ায়া তুরেদের মতো তারকা থাকা সত্ত্বেও গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি তারা।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও জায়গা হয়নি তাদের। ফলে এবার শুধু বিশ্বকাপে ফেরা নয়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ওঠাও ছিল বড় অর্জন। সেই অর্জনকে আরো বড় করেছে তাদের গ্রুপ পর্বের পথচলা।
ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও জার্মানির কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় আইভরিকোস্ট। তবে শেষ ম্যাচে কুরাসাওকে ২-০ গোলে হারিয়ে জায়গা করে নেয় শেষ ৩২-এ। ৩ ম্যাচে তারা করেছে ৫ গোল, হজম করেছে ২টি। রক্ষণভাগের দৃঢ়তাই মূলত তাদের বড় শক্তি।
অন্যদিকে নরওয়ের গল্পটা প্রত্যাবর্তনের। ১৯৯৮ সালের পর দীর্ঘ ২৮ বছর বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যায়নি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটিকে। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা ফিরেছে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে।
গ্রুপ পর্বে ইরাককে ৪-১ ও সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের আক্রমণাত্মক সামর্থ্যের পরিচয় দেয় তারা। শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়ে নকআউটের প্রস্তুতিই নিয়েছিল নরওয়ে।
তিন ম্যাচে নরওয়ে করেছে ৮ গোল, তবে হজমও করেছে ৭টি। অর্থাৎ আক্রমণে তারা যেমন ভয়ঙ্কর, রক্ষণেও ততটাই ভঙ্গুর। এখন পর্যন্ত নরওয়ের তিন ম্যাচে মোট ১৫টি গোল হয়েছে, যা ম্যাচপ্রতি গড়ে ৫ গোল- চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সর্বোচ্চ গড়।
এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ডালাসেও গোলসমৃদ্ধ একটি ম্যাচের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। যেখানে সবচেয়ে বেশি আশা দেখাচ্ছেন আর্লিং হলান্ড। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মাত্র দুই ম্যাচ খেলেই তিনি করেছেন ৪টি গোল।
প্রতিপক্ষের জন্য তিনি যেন আতঙ্ক। তার সাথে মাঝমাঠে মার্টিন ওডেগার্ড নরওয়ের আক্রমণকে আরো ধারাল করেছে। অন্যদিকে আইভরিকোস্টের আশা নিকোলাস পেপে, আমাদ দিয়ালো, ইয়ান দিয়োমান্দেকে ঘিরে।
তবে এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব থাকবে রক্ষণভাগের নেতা উসমান দিওমান্দের কাঁধে। বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হলান্ডকে থামাতে পারলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই চলে আসতে পারে আফ্রিকান দলটির হাতে।
আরেকটি পরিসংখ্যান ম্যাচটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলছে। দু’দল এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হয়নি। অর্থাৎ ডালাসেই লেখা হবে নরওয়ে ও আইভরিকোস্টের প্রথম সাক্ষাতের ইতিহাস।
একদিকে ১৯৯৮ সালের পর প্রথম নকআউট ম্যাচ খেলতে নামছে নরওয়ে। অন্যদিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার নকআউট পর্বে জয়ের স্বপ্ন দেখছে আইভরিকোস্ট।
শেষ পর্যন্ত ডালাস কি দেখবে হলান্ডের আরেকটি গোল উৎসব? নাকি আফ্রিকান হাতিরা লিখবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়? উত্তর মিলবে মাঠেই। অপেক্ষা করতে হচ্ছে রাত ১১টা পর্যন্ত।



