আল মাহমুদ
পেনাল্টি শট মানেই ফুটবলে অন্যরকম এক উন্মাদনা। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, পেনাল্টি স্পটে এসে দুই দলের জেতার সম্ভাবনাই হয়ে দাঁড়ায় ফিফটি-ফিফটি। তখন ফুটবলারদের মাথায় চেপে বসে এক পৃথিবী সমান মানসিক চাপ, আর গ্যালারি কিংবা টিভি পর্দার সামনে থাকা দর্শকদের হার্টবিট মুদ্রাস্ফীতির মতো লাগাতার বাড়তেই থাকে। পেনাল্টির একটিমাত্র শট হয়তো কোনো দেশকে ভাসায় কান্নায়, নয়তো জয়োল্লাসে তৈরি করে নতুন এক ইতিহাস। ইতিহাসের তেমনি কয়েকটি পেনাল্টি শট নিয়ে আলোচনা করা যাক।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্সের ফাইনাল (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্সের ম্যাচটি শুধু একটি ফাইনাল নয়; বরং ছিল আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা ৩-৩ গোলে ড্র থাকার পর ম্যাচটি গড়ায় টাইব্রেকারে ।
টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার পক্ষে লিওনেল মেসি, পাওলো দিবালা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও গঞ্জালো মন্টিয়েল গোল করেন। অন্যদিকে, ফ্রান্সের হয়ে গোল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও কোলো মুয়ানি। আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের জন্য এই শটটি ছিল চূড়ান্ত। গঞ্জালো মন্টিয়েল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হুগো লরিসকে ভুল দিকে পাঠিয়ে পোস্টের বাম কোণ দিয়ে বল জালে জড়ান। ৪-২ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
ব্রাজিল ও ইতালির ফাইনাল (১৯৯৪)
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও ইতালি। নির্ধারিত ৯০ ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য থাকার পর, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়।
ইতালির অধিনায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসি প্রথম শট মিস দিয়ে টাইব্রেকারের যাত্রা শুরু করেন। ইতালির পক্ষে গোল করেন দেমেতরিও আলবার্তিনি ও আলবেরিকো ইভানি। আর ব্রাজিলের পক্ষে রোমারিও, ব্রাঙ্কো ও ব্রাজিলের অধিনায়ক দুঙ্গা।
ইতালির হয়ে পঞ্চম শটটি নিতে আসেন তাদের পুরো টুর্নামেন্টের নায়ক রবার্তো ব্যাজিও। ইতালিকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখতে এই শটে গোল করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ব্যাজিওর নেয়া শটটি ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে শূন্যে ভেসে চলে যায়। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিল ২৪ বছরের বিশ্বকাপের খরা কাটায়।
জিনেদিন জিদান–২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল
২০০৬ সালের বার্লিন ফাইনাল, ফ্রান্স বনাম ইতালি। ম্যাচের মাত্র ৭ম মিনিটেই পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। পেনাল্টি নিতে আসেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর জিনেদিন জিদান।
কিন্তু তার সামনে ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক জানলুইজি বুফন। জিদান সবাইকে চমকে দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় একটি ‘পানেনকা’ শট নেন। বলটি ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ঠিক ভেতরে ড্রপ খেয়ে বাইরে চলে আসে। রেফারি গোলের বাঁশি বাজান। যেটি ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম গোলগুলোর একটি।
তবে আক্ষেপের বিষয় সোনালী ট্রফি অধরাই থেকে গেল তার। কিন্তু এই মহারথীর কাছে বিশ্বকাপের চেয়ে নিজের বোনের সম্মান বেশি দামী ছিল।
সুয়ারেজের ‘হ্যান্ড অফ গড’-২০১০ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ে বনাম ঘানা। অতিরিক্ত সময়ের ১২০ মিনিটে ঘানার একটি নিশ্চিত গোল গোললাইন থেকে হাত দিয়ে ঠেকিয়ে লাল কার্ড পান উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ। ঘানা পায় পেনাল্টি।
ম্যাচটি সেই সময় আটকে ছিল ১-১ গোলের সমতায়। গোলটি হয়ে গেলে ম্যাচ জিতে ঘানা হতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান দেশ।
কিন্তু সেদিন ঘানার ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল। প্যানাল্টি মিস করে দলটি। এরপর ম্যাচটি গড়ায় টাইব্রেকারে। পরে ৪-২ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে উরুগুয়ে।
ডেভিড বেকহ্যাম (ইংল্যান্ড)–২০০২ বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্ব
১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড পেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের পোস্টার বয় ডেভিড বেকহ্যাম। ইংল্যান্ড ম্যাচটি হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় এবং পুরো দেশ বেকহ্যামকে ‘খলনায়ক’ বানিয়ে দেয়।
চার বছর পর, ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই আবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৪৪ মিনিটে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। পুরো ইংল্যান্ডের কোটি ভক্তের চোখ তখন বেকহ্যামের দিকে। তীব্র মানসিক চাপের মুখে বেকহ্যাম আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক পাবলো কাভালেরোকে পরাস্ত করে একদম মাঝখান দিয়ে বুলেট গতির এক শটে গোল করেন।
ইংল্যান্ড ১-০ গোলে ম্যাচটি জেতে এবং আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। এই একটি পেনাল্টি শট বেকহ্যামের জীবনের সবচেয়ে বড় ‘রেডেম্পশন’ বা প্রায়শ্চিত্তের গল্প তৈরি করে, তিনি রাতারাতি খলনায়ক থেকে আবার জাতীয় বীরে পরিণত হন।
ফুটবল যুবরাজের আক্ষেপের শেষ পেনাল্টি
ফুটবলে প্রতিনিয়ত কত ইতিহাস তৈরি হয়। যেমন রোববার দিবাগত রাতে ফুটবলের যুবরাজ খ্যাত নেইমার পেনাল্টি শটে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ গোল করে ফুটবল থেকে বিদায় নিলেন। ২-১ গোলে নরওয়ে কাছে ম্যাচটি হারে ব্রাজিল। এর মধ্য দিয়ে রাউন্ড অব ১৬ থেকে বিদায়।
দলের একমাত্র গোল আসে নেইমারের পা থেকে। আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন দলের জন্য শেষ গোল করে।


