কেপ ভার্দের জার্সিতে বাংলাদেশের ছোঁয়া, নেপথ্যে কী?

যদিও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের মাঠে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি, সহকারী রেফারি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদের (ভিএআর) গায়ে যে অফিশিয়াল জার্সি ও সম্পূর্ণ কিট ছিল, তা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশে। অ্যাডিডাস সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে রিসাইকেলড প্লাস্টিকের সুতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের কারখানায় এই রেফারি কিটগুলো তৈরি করায়।

আল মাহমুদ
বাংলাদেশ কবে বিশ্বকাপ খেলবে—এ প্রশ্ন বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর। বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বাতাসে দুলে উঠতে দেখা কোটি বাঙালির স্বপ্ন। তবে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে না থাকলেও, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ঠিকই পৌঁছে গেছে বিশ্বমঞ্চের সবুজ ঘাসে।

বাংলাদেশে তৈরি এবং এ দেশের মানুষের হাতে বোনা জার্সি গায়ে জড়িয়ে এবার বিশ্বকাপ মাতাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের এক নতুন রূপকথা। ২০২৬ বিশ্বকাপে বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়া আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যখন মাঠ মাতাচ্ছেন, তখন তাদের গায়ে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের টঙ্গী-তুরাগের শ্রমিকদের হাতে তৈরি জার্সি।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে আগে কোনো দেশের অফিশিয়াল জার্সির কার্যাদেশ পেয়েছে- এমন কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কিভাবে বাংলাদেশীদের হাতের বুনন কেপ ভার্দের গায়ে জড়ালো?

কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন (এফসিএফ) সরাসরি বাংলাদেশের কোনো কারখানার সাথে যোগাযোগ করেনি। তারা যখন আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (এএফসিওএন) খেলেছিল, তখন তাদের অফিশিয়াল কিট স্পন্সর ছিল অস্ট্রিয়াভিত্তিক স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড টেম্পো। পরবর্তীকালে মার্কিন স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড ক্যাপেলি স্পোর্ট তাদের কিট পার্টনার হয়।

এই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব কোনো বড় উৎপাদন কারখানা থাকে না। তারা ডিজাইন চূড়ান্ত করার পর বিশ্বস্ত কোনো দেশের কারখানাকে অর্ডার দেয়। টেম্পো এবং ক্যাপেলি স্পোর্টস—উভয় ব্র্যান্ডেরই সোর্সিং পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সাথে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।

বাংলাদেশের ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বা পরিবেশবান্ধব কারখানার ইমেজ এবং কঠোর ডেডলাইন মেনে চলার সুনামের একটি বড় ভূমিকা ছিল। কারণ বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো এখন কমপ্লায়েন্স ও শ্রমিক অধিকারের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হয়েই অর্ডার দেয়।

কেপ ভার্দে জাতীয় দলের জার্সিতে ব্যবহৃত উচ্চপ্রযুক্তির বিশেষ ফাংশনাল ১০০% পলিয়েস্টার ইন্টারলক কাপড়টি সরবরাহ করে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বিখ্যাত টেক্সটাইল জায়ান্ট ইয়ঙ্গান করপোরেশন। আর সেই কাপড় দিয়ে ক্যাপেলি স্পোর্ট-এর নিখুঁত নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী মূল জার্সি উৎপাদনের কঠিন কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করে ঢাকার তুরাগে অবস্থিত বাংলাদেশী কারখানা গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলিং লিমিটেড।

এবার বিশ্বকাপ তিনটি দেশ মিলিয়ে আয়োজন করছে। তাই অংশ নেয়া দলগুলোকে তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে খেলতে হচ্ছে। কোথাও তীব্র গরম ও আর্দ্রতা, আবার কোথাও হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাস। আর এই পলিয়েস্টার ইন্টারলক ফেব্রিক শরীর থেকে ঘাম দ্রুত শুষে নেয় এবং কাপড়ের উপরিভাগে এনে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। ফলে জার্সি ঘেমে ভারী হয়ে যায় না এবং খেলোয়াড়রা দীর্ঘক্ষণ শুষ্ক বোধ করেন।

এ ছাড়া, এই কাপড়ের বিশেষ বুনন কৌশলের কারণে বাতাস খুব সহজে জালের মতো যাতায়াত করতে পারে। আমেরিকার প্রখর রোদেও এটি খেলোয়াড়দের শরীরের অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দেয় এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা শীতল ও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

আবার, ম্যাচ-ডে জার্সির ক্ষেত্রে ওজনের সামান্য হেরফেরও খেলোয়াড়দের ৯০ মিনিটের দৌঁড়াদৌড়িতে প্রভাব ফেলে। এই কাপড়টি ওজনে অত্যন্ত হালকা হওয়ায় ফুটবলাররা কোনো চাপ ছাড়া খেলতে পারেন।

বাংলাদেশ কেন শুধু ‘ফ্যান জার্সি’তে সীমাবদ্ধ?
জার্সি কোনো সাধারণ পোশাক নয়। অ্যাডিডাসের ক্লাইমাকুল প্লাস, নাইকির ড্রাই-ফিট অ্যাডভান্স কিংবা পুমার আল্ট্রাউইভ প্রযুক্তির মতো বিশেষ ফেব্রিক ও প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় এসব জার্সিতে। এসব প্রযুক্তির কারণে জার্সি ঘাম শুষে নেয় কিংবা গরমের মধ্যেও শীতল থাকে। ফলে জার্সি শুধু সেলাই বা উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হয় না। এর বাইরে প্রযুক্তির আলাদা প্রতিযোগিতা চলে।

পোশাক রফতানিকারকদের মতে, বিশ্বকাপের ফ্যান জার্সির বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি দৃশ্যমান। তবে অফিশিয়াল জার্সির বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে জায়গা করে নিতে হলে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যারে আরো বড় বিনিয়োগ করতে হবে। যদিও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখনো সস্তা পোশাক উৎপাদন ও রফতানিতে ঝুঁকে আছে। উচ্চমানের পোশাক উৎপাদনে গবেষণা ও দক্ষতা বাড়াতে বিনিয়োগে আগ্রহ নেই তাদের।

যদিও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের মাঠে ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারি, সহকারী রেফারি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদের (ভিএআর) গায়ে যে অফিশিয়াল জার্সি ও সম্পূর্ণ কিট ছিল, তা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশে। অ্যাডিডাস সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে রিসাইকেলড প্লাস্টিকের সুতা ব্যবহার করে বাংলাদেশের কারখানায় এই রেফারি কিটগুলো তৈরি করায়।

তারপর চলতি বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের জার্সি দিয়ে কোনো দেশের অফিশিয়াল জার্সির অংশ হলো বাংলাদেশ। নিকট ভবিষ্যতে এই খাতে বাংলাদেশের বিনিযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাতে পারবে না তা তো বলা যায় না।