বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, এটি নানা সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষের এক মিলনমেলা। সেই বৈচিত্র্যকে আরো সম্মান জানাতে ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে ফিফা।
এবার ম্যাচসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গ্রহণের ক্ষেত্রে মুসলিম ফুটবলার, অপ্রাপ্তবয়স্ক খেলোয়াড় কিংবা অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে অনিচ্ছুকদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
বিশ্বকাপের ‘সুপিরিয়র প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারের পৃষ্ঠপোষকতা করছে প্রসিদ্ধ বিয়ার ব্র্যান্ড মাইকেলব আল্ট্রা। সাধারণত ম্যাচসেরা খেলোয়াড়দের হাতে যে ট্রফি তুলে দেয়া হয় ও যে ব্যাকড্রপের সামনে ছবি তোলা হয়, সেখানে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের লোগো স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত থাকে।
তবে এবার নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তাদের জন্য ব্যবহৃত ট্রফি ও ব্যাকড্রপে স্পন্সরের লোগোর পরিবর্তে রাখা হয়েছে বিশ্বকাপের নিজস্ব ব্র্যান্ডিং ও ‘দ্য সুপিরিয়র প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ শিরোনাম।
বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে মরক্কোর মিডফিল্ডার ইসমাইল সাইবারিকে ঘিরে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে টুর্নামেন্টের দ্রুততম গোল করে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়ার পর পুরস্কার গ্রহণের সময় দেখা যায়, তার হাতে থাকা ট্রফিতে কোনো অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের লোগো নেই।
পরে জানা যায়, একই ধরনের স্পন্সরবিহীন ট্রফি পেয়েছেন মিসরের ইমাম আশুর, জর্ডানের আলি অলওয়ান, ইরানের রামিন রেজাইয়ান, কাতারের গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা এবং আইভরি কোস্টের ইয়ান দিয়োমান্দেও।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা।
ইসলাম ধর্মে মদ জাতীয় পানীয় নিষিদ্ধ হওয়ায় অনেক মুসলিম খেলোয়াড় অ্যালকোহল-সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রচারণার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে অস্বস্তিবোধ করেন। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, নির্বাচিত খেলোয়াড়ের অনুরোধের ভিত্তিতে স্পন্সরবিহীন ট্রফি ও ব্যাকড্রপ ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। শুধু মুসলিম খেলোয়াড়ই নন, অন্য ধর্মাবলম্বী কিংবা ব্যক্তিগত কারণে অ্যালকোহল ব্র্যান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হতে না চাওয়া ফুটবলাররাও এই সুবিধা নিতে পারেন।
তবে এটি ফিফার জন্য একেবারে নতুন কোনো পদক্ষেপ নয়। ২০২৫ সালের ক্লাব বিশ্বকাপেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। সে সময় পিএসজির মরক্কান ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি ধর্মীয় কারণে স্পন্সরবিহীন ট্রফি গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ান প্রতিভা এস্তেভাও, যিনি তখন পালমেইরাসের হয়ে খেলছিলেন এবং বয়সে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন, তিনিও একই সুবিধা পেয়েছিলেন।
অ্যালকোহল স্পন্সরশিপ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য ফুটবলে নতুন নয়। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মিসরের গোলরক্ষক মোহাম্মদ এল-শেনাওয়ি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অ্যালকোহল ব্র্যান্ড-সম্পৃক্ত ম্যাচসেরার পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও বাণিজ্যিক স্পন্সরশিপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি আরো গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন লিগ ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মুসলিম খেলোয়াড়দের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও উদযাপনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে।



